সর্ব ধর্মের সমন্বয়ক ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ

উদয় শংকর চক্রবর্তীঃ পৃথিবীতে যখন বিভিন্ন জাতি-গোষ্টি, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন বর্ণবাদ পৃথিবীকে উতপ্ত করে তুলেছিল, তখন কামার পুকুরে ১৮৩৬ সালে আবির্ভূত হলেন গদাধর বা গদাই। এই গদাধর অতি সাধারণ মানুষের অবয়বে ঘোষণা করলেন পৃথিবীতে যত মত আছে সব মতই ঈশ্বরের মত, এর যে কোন একটি মতে জীবন পরিক্রমা শেষে ঈশ্বরে পৌছানো যায়, সেই মতটি সনাতন হতে পারে, সেই মতটি ইসলাম হতে পারে সেই মতটি বৌদ্ধ হতে পারে, সেই মতটি হতে পারে যিশু খ্রীস্ট্রের খ্রীস্ট ধর্ম। এই অবতারই ঘোষণা দিলেন সব মতই ঈশ্বরের মত, তাই ঠাকুর রামকৃষ্ণের অমর বাণী -‘যত মত তত পথ’। সব পথেই ঈশ্বরে পৌছানো যায় শুদ্ধভাবে পথ চললে সেই পথই তোমাকে ঈশ্বরের তথা পরম আত্ময়ে পৌছে দেবে। এই দর্শন প্রচারের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হল ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব সকল ধর্মের সমন্বায়ক জগতের কল্যাণ তথা মানবের মুক্তিই তার জীবন দর্শন।

 

ভারত ও পাশ্ববর্তী দেশ সমূহের আধ্যত্বিকভাবে ও বিশ্বাস সকল দিক আলোচনা করিলে উহাদিগণের মধ্যে বিশেষ প্রভেদ উপলব্ধি হয়। দেখা যায় ঈশ্বর, আত্মা পরকাল প্রভৃতি ইন্দ্রিয়াতীত বস্তুসকলকে ধ্রব সত্যজ্ঞানে প্রত্যক্ষ করিতে অতি প্রচীনকালে হইতে ভারত নিজ সর্বস্ব নিয়োজিত করিয়াছে এবং ঐরূপ সাক্ষাৎকার বা উপলব্ধি কেউ ব্যক্তিগত এবং জাতিগত স্বার্থের চরম সীমারূপে সিদ্ধান্ত করিয়াছে। উহার সমগ্র চেষ্টা এক অধ্যাতিœকতায় চিরকালের জন্য রঞ্জিত হইয়া রহিয়াছে ধর্মই ভারতের সর্বস্ব মহাপুরুষ সকলের ভারতে প্রতিনিয়ত জন্মগ্রহণই ঐ রুপ হইবার কারণ ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ দর্শনের উপরে ভারতের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত একথা সহজেই অনুমিত হয় ভারতে অবতার বিশ্বাস উপস্থিত হইবার কারণ ও ক্রম সাংখ্য দর্শনোক্ত কল্প নিয়ামক ঈশ্বর ও ঈশ্বর কোটি অবতার বিশ্বাসের অন্য কারণ গুরু উপাসনা বেদ এবং সমাধি প্রসুত দর্শনের উপার অবতারবাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরের করুনার উপলব্ধি হইতেই পৌরনিক যুগে অবতার বাদ প্রচার অবতার পুরুষ ঈশ্বরের ন্যায় নিত্যশুদ্ধ-বুদ্ধি-মুক্ত-স্বভাব অবতার পুরুষের অখন্ড স্মৃতি শক্তি। অবতার পুরুষের নব ধর্ম স্থাপনের জন্যই আগমন হইয়াছে বর্তমানকালের যুগ প্রয়োজন সাধিত করিতে অবতার পুরুষের শুভাগমন প্রত্যক্ষ করিয়া ভারত পুনরায় ধন্য হইয়াছে।

 

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের পিতার নাম ক্ষুদিরাম চট্রোপাধ্যায় মাতা চন্দ্র মনি দেবী। ক্ষুদিরাম নিষ্টাবান ব্রাক্ষণ, রঘুবীরের উপাসক ও পরম ভক্ত ছিলেন। মাতা চন্দ্র মনি ছিলেন দয়া ও সরলতার প্রতিমূতি। ষাট বছর বয়সে ক্ষুদ্রিরাম পিতৃ পুরুষের পিন্ডদান করতে গয়াধামে যান। পিতৃ পুরুষের কার্যাদি সুসম্পন্ন করে তিনি খুব তৃপ্তিলাভ করলেন। সেই রাত্রে নবদূর্বাদল শ্যাম তনু জ্যোতি ঘন শ্রী গদাধর নারায়নের দিবৎ দর্শন পান তিনি দেখলেন গয়ায় বিষ্ণু মন্দিরে তিনি পিতৃ পুরুষগণের উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করছেন আর চারিধারে তাঁর পিতৃ পুরুষগণ দিবৎ জ্যোতি বিকীর্ণ করে সাক্ষাৎ তা গ্রহণ করছেন। পরে দেখেন তাঁর প্রণমৎ পিতৃ পুরুষগণ পরম শ্রদ্ধায় কোন এক দিব্য পুরুষকে প্রণাম করছেন। ক্ষুদ্রিরামের মন প্রাণ সেদিকে আকৃষ্ট হতেই তিনি পরম গম্ভীর জ্যোতির্ময় নারায়নের দর্শন লাভ করেন। ক্ষুদ্রিরাম আনন্দে আপ্লুত হয়ে গলদ শ্রুধারায় বক্ষস্থল প্লাবিত করে স্তব করতে করতে সে- দেব বিগ্রহকে প্রণাম করলেন।

তিনি প্রসন্ন হয়ে মেঘ গম্ভীর স্বরে বললেন-ক্ষুদিরাম তোমার ভক্তিতে পরম প্রসন্ন হয়েছি, পুত্ররূপে তোমার ঘরে আবিভূত হয়ে তোমার সেবা গ্রহণ করব; গরীব বলে সেবার ত্রুটির সভয়ে নিবেদন করলেন ক্ষুদিরাম, সত্য সত্য পুত্র হলে দরিদ্র আমি আপনার সেবা কি করতে পারব ঐ করুণ অকপট ভয়-বিহবল বাক্যে করুণাময়ের করুনা যেন আরো উথলে উঠল। তিনি অভয় দিয়ে বললেন ভয় নাই ক্ষুদিরাম, তুমি যা দেবে তাতেই আমি তৃপ্ত থাকব: আমারে অভিলাষ পূরণে আপত্তি করোনা । ক্ষুদিরাম বলতেন –

“এ অতি মঙ্গল কথা না করিবা ভয়
হইবে গোকুল চাঁদ ভুবনে উদয় ”

অবশেষে ১৮৩৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বুধবার ভোররাতে বালক জন্ম গ্রহণ করেন প্রসূতিকে দ্রুত হস্তে সাহায্য করেই ধনী কামারনী জাতকের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই চমকে উঠলেন, যে স্থানে তাকে রাখা হয়েছিল সে তো সেখানে নেই। গেল কোথায় ভয়ে বিহবলা ধনী প্রদীপের স্বল্প আলোকে শিশুকে খুজতে খুজতে দেখতে পেলেন ধান সেদ্ধ উনুনের মধ্যে বিভূতি ভূষিতাঙ্গ এক ছয় মাসের ছেলের মতো বড় সবাঙ্গ সুন্দর বালক প্রদীপের এই আলোকে এই অদ্ভুত দু-চার জন মহিলা সংবাদ দিতেই সেই প্রসন্নগম্ভীর ব্রাক্ষমুহূর্তে মঙ্গল শঙ্খ বেজে উঠল-তপস্বী ক্ষুদিরামের গৃহ প্রাঙ্গঁণ ওলুধ্বনিতে সে মঙ্গল সমাচার সংসার মধ্যে প্রচারিত হল। নিদ্রিত গ্রামবাসীর কেউ কি জেনেছিল, কে এল গোপনে ?

 

শাস্ত্রজ্ঞ ক্ষুদিরাম নবজাতকের জন্মলগ্ন বিচার করে দেখলেন জাতক শুভলগ্নে সংসারে এসেছে। জাত কর্ম সমাপন করে রাশি অনুসারে নাম রাখলেন শ্রী শম্ভুচরন এবং গয়াধামের স্বপ্নস্মরণ করে নাম রাখলেন শ্রী গদাধর রামভক্ত ক্ষুদিরাম ভাল নাম রাখলেন ‘রামকৃষ্ণ’ ডাকনাম গদাধর ক্রমেতা গদাই-এ রূপনিল ছেলে বেলার প্রসঙ্গে স্বমুখে বলেছিলেন ও দেশে ছেলেবেলায় আমায় পুরুষ-মেয়ে সকলে ভালবাসত আর গান শুনত আর লোকদের নকল করতে পারতুম সেই সব দেখত ও শুনত। এক এক যাত্রার সমস্ত পালাগান গেয়ে দিতে পারতুম। শুধু কি তাই যাত্রার সকল ভূমিকার সার্থক অভিনয় গদাই একাই করতে পারতেন। কি পুরুষ কি নারী যে কোনও ভুমিকায় গদাই ছিল কর্মচারী-স্বচ্ছন্দে তা করে দেখাতে পারতেন, জীবন্তভাবে বলতেন বাড়ীর বউরা আমার জন্য খাবার রেখে দিত। কিন্তু কেউ অবিশ্বাস করত না সকলে দেখত যেন বাড়ীর ছেলে “ কিন্তু সুখের পায়রা ছিলুম বেশ ভাল সংসার দেখলে আনাগোনা করতুম যে বাড়ীতে দুঃখ বিপদ দেখতুম সেখান থেখে পালাতুম”
লোকোত্তর মহাপুরুষদের কাহিনী সর্বদাই সাধারণ মানুষের বুদ্ধির অতীত হয়ে থাকে। সমকালের লোক আনন্দ-মত্ত হয়ে সে সকলের গূঢ় রহস্য বুঝতে চাইতেন না। আনন্দে মত্ত থাকতেন তবে কেউবা বুঝতে পারতেন, অধিকাংশই তা পারতেন না।

 

শ্রী ভগবানের অসীম করুনরে প্রকাশ বলতে হবে যে, পূর্ব-পূর্বকালে যে সকল অবতার তিনি মানুষকে ধর্ম পথ দেখিয়ে ছিলেন সে সবগুলিকে গ্রথিত করে বর্তমান মানুষের যুগচেতনানুযায়ী সরল গম্ভীর লীলাময় জীবন-যাপন করে বহুবিধ জটিল যুগ-ধারণাকে পূর্ণ করে দিয়েছেন এবারে শ্রীরামকৃষ্ণ আবির্ভাবকে অবলম্বন করে, স্বামীজীর অনবদ্য ভাষায়- বেদ, বেদান্ত আর সব অবতার যা কিছু করে গেছেন, তিনি একলা নিজের জীবনে তা করে দেখিয়ে গেছেন। তাঁর জীবন না বুঝলে বেদ, বেদান্ত অবতার প্রভৃতি বোঝা যায় না, কেননা – ঐব ধিং ঃযব বীঢ়ষধহধঃরড়হ (তিনি ব্যাখ্যা স্বরুপ ছিলেন) তিনি যেদিন থেকে জন্মেছেন সে দিন থেকে সত্য যুগ এসেছে। এখন সব ভেদাভেদ উঠে গেল আচন্ডলে প্রেম পাবে মেয়ে -পুরুষ ভেদ ধনী-নির্ধন ভেদ, পন্ডিত-বিদ্বান ভেদ, ব্রাক্ষণ-চন্ডাল ভেদ সবতিনি দূরে দিয়ে গেলেন। আর তিনি বিবাদভঞ্জন হিন্দু-মুসলমানভেদ, ক্রিশ্চান-হিন্দু ভেদ ইত্যাদি সব চলে গেল ঐ যে ভেদাভেদ লড়াই ছিল তা অন্য যুগের; এ সত্য যুগে তাঁর প্রেমে বন্যায় সব একাকার।

 

ধর্মের এক সর্বব্যাপক রূপ, যা বর্তমানের তৃষিত জীবন চেতনার অমৃত পীষুষ, তা শ্রী রামকৃষ্ণ জীবনে মূর্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভাব সর্ব ধর্ম সাধন তার অধিকারী ভেদে ধর্ম পদ্ধতির প্রয়োগ এবং অমানব ত্যাগ ও সেবার আদর্শ আজকের মানুষের সকল চেতনাকে পরিতৃপ্ত করে সত্যানুভৃতির দিব্যালোকের দিকে আকর্ষণ করেছে। তিনি একরূপে নিত্য, একরূপে লীলা। তিনি জীব জগৎ হয়েছেন ; চতুবিংশতি তত্ব হয়েছেন। যখন নিস্ক্রিয় তখন তাঁহাকে ব্রক্ষ্মা বলি যখন সৃষ্টি করেছেন পালন করেছেন, সংহার করছেন-তখন তাঁকে শক্তি বলি। ব্রক্ষ্মা আর শক্তি অভেদ। জল স্থির থাকলেও জল হেললে দুললেও জল, তিনি একরূপে নিত্য একরূপে লীলা তাইতো ঠাকুরের প্রধান শিষ্যে স্বামী বিবেকান্দ বললেন জাতপাত ধর্ম নয় কামার কুমার জেলে নয়, ব্রাক্ষ্মাণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য শূদ্র নয়, হিন্দু মুসলমান বুদ্ধ খ্রীস্টান নয়।

‘জীবে প্রেম করে যে জন
সে জন সেবিছে ঈশ্বর’।

উপাধ্যক্ষ উদয় শংকর চক্রবর্তী
জেনারেল সেক্রেটারী
শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রাম।

Share This:

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.