পুরুষোত্তম শ্রীরাম

উপাধ্যক্ষ উদয় শঙ্কর চক্রবর্ত্তী, জেনারেল সেক্রেটারী, শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রাম: সরযু নদীর দক্ষিণ তীর সপ্ততীর্থের বা পুরের (মথুরা, হরিদ্বার, বারানসী, অযোধ্যা, উজ্জয়িনী, দ্বারকা এবং কাষ্ণী) অন্যতম পুণ্যতীর্থ তথা মোক্ষপুরী অযোধ্যা।
অযোধ্যা নগরীর অতীত গরিমা আজ আর নেই। অযোধ্যার মূল আকর্ষণ ত্রেতা যুগে বিষ্ণুর ৭ম অবতার রূপী শ্রীরামচন্দ্রের জন্ম এই অযোধ্যায়। সূর্য বংশীয় নৃপতি দিলীপ, দিলীপের পুত্র রঘু, রঘুর পুত্র অজ এবং অজের পুত্র দশরথ অযোধ্যায় রাজা ছিলেন।
রাজা দশরথের অশ্বমেধ যজ্ঞ লব্ধ জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামচন্দ্র:
দশরথের তিন রানীর গর্ভে চার পুত্রের জন্ম হয়। তার মধ্যে কৌশল্যার গর্ভজাত রাম সর্বজ্যেষ্ঠ। এর পরে কৈকেয়ীর পুত্র ভরত ও সুমিত্রার পুত্র লক্ষ্মণ ও শত্রুঘœ যথাক্রমে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ। রামের ১৪ বৎসর বয়:ক্রম কালে ঋষি বিশ্বামিত্র রাক্ষসদের হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য দশরথের অনুমতিক্রমে রাম ও লক্ষ্মণকে নিজের আশ্রমে নিয়ে যান এবং রামকে বলা ও অতি বলা বিদ্যা ও দিব্যাস্ত্র সকল দান করেন। রাম তাড়কা এবং অন্যান্য রাক্ষসদের বধ করে মহর্ষির যজ্ঞে রক্ষা করেন।
অত:পর ঋষি বিশ্বামিত্র রাম-লক্ষণ সহ মিথিলা যাত্রা করেন। পথে তারা গৌতম মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলে, গৌতম মুনির শাপে পাষাণ হয়ে যাওয়া অহল্যাকে শ্রীরাম শাপ মুক্ত করেন তাঁর চরণ স্পর্শ দিয়ে। মিথিলায় জনক রাজার আতিথ্য গ্রহণ করে বিশ্বামিত্রের পরামর্শে রাম রাজা জনকের “হরধনু” ভঙ্গ করে জনক কন্যা সীতা দেবীকে বিবাহ করেন। লক্ষ্মনের সাথে সীতার কনিষ্ঠা ভগিনী উর্মিলার বিবাহ হয়। শিবের হরধনু ভঙ্গ করার সময় বিষ্ণুব ষষ্ঠ অবতার শ্রী পরশুরাম জীবিত ছিলেন। তিনি ছিলেন শিবের শিষ্য। সে কারনে হরধনু ভঙ্গঁ করাতে তিনি শ্রীরামের উপর কুপিত হন। দু’জনই বিষ্ণুর অবতার হওয়া সত্ত্বেও পরশুরাম-রামকে যুদ্ধে আহ্বান করেন এবং রামের হস্তে পরাজিত হন।
কিছুকাল পরে রাজা দশরথ রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে ইচ্ছা করেন। এই সংবাদে দাসী মন্থরার প্ররোচনায় রাজা দশরথের দ্বিতীয় স্ত্রী ভরত-জননী কৈকেয়ী ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। আশৈশব রামকে ¯েœহ করলেও মন্থরার প্ররোচনায় কৈকেয়ী রাজা দশরথের পূর্ব প্রতিজ্ঞার সুযোগে, “এক বরে ভরতের যৌবরাজ্য লাভ আর অন্য বরে রামের চৌদ্দ বৎসর বনবাসের ব্যবস্থা করলেন।” এর ফলে সীতা ও লক্ষ্মণ রামের অনুসরণ করেন।
পিতৃ সত্য পালনার্থে শ্রীরাম, লক্ষ্মণ ও সীতার সঙ্গেঁ দক্ষিণ দিকে যাত্রা করে বন্ধু নিষাদ রাজ গুহকের সাহায্যে গঙ্গাঁ উত্তীর্ণ হন। প্রয়াসের নিকট ভরদ্বাজ মুনির আতিথ্য গ্রহণ করেন ও তার পরামর্শে দন্ড কারন্যের চিত্রকূট পর্বতে বাস করতে থাকেন। রামের বনে গমনের পর রাজা দশরথ পুত্রশোকে প্রাণত্যাগ করেন। শ্রীরামানুজ ভরত রাজ্য লোভ ত্যাগ করে শ্রীরামকে ফিরিয়ে আনবার জন্য চিত্রকূটে উপস্থিত হন। শ্রীরাম পিতৃ সত্য পালনের জন্য বনবাস কাল পূর্ণ করবার সন্ধকল্প স্থির রাখেন। তাতে ভরত রামের পাদুকা তাঁর প্রতীক-স্বরুপ সিংহাসনে স্থাপন করে রামের প্রতিনিধি রূপে নন্দী গ্রামে বাস করে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। এরপর এক আশ্রম থেকে অন্য আশ্রমে বাস করে রাম নির্বাসনের দশ বৎসর কাটিয়ে বিন্ধ পর্বতে অ্যাস্ত্যমুনির আশ্রমে এসে উপস্থিত হন। অ্যাস্ত্যমুনি সমাদরে অতিথি সৎকার করে রামকে বৈষ্ণব ধনু, ব্রহ্মাস্ত্র ও অক্ষয় তূনীর দান করলেন। মহর্ষির উপদেশানুসারে শ্রীরাম গোদাবরীর তীরে পষ্ণবটী বনে কুটীর নির্মাণ করে বাস করতে লাগলেন। তখন এই বনে রাক্ষসে পরিপূর্ণ ছিল। রাবনের বিধবা ভগিনী শুর্পনখা এই বনে বাস করত। এই রাক্ষসী রামের রূপে মুগ্ধ হলে তাকে প্রণয় নিবেদন করলে রাম কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত ও বিতাড়িত হয়ে সীতাকে গ্রাস করবার চেষ্টা করে। শ্রীরামের আদেশে লক্ষ্মণ এই রাক্ষসীর নাক ও কান কেটে দিলেন, তারপর শূর্পনখার দুই ভ্রাতাখর ও দুষণ রামকে আক্রমণ করলে, শ্রীরাম তাদের দুজনকে এবং সমস্ত সৈন্যকে বধ করে পঞ্চবটীবন রাক্ষস শূন্য করেন। শূর্পনখা তখন তার ভ্রাতা রাবণের নিকট সমস্ত সংবাদ নিবেদন করল। রাবণ সীতার রূপলাবন্যের কথা শুনে মুগ্ধ হয় ও ভগিনীর অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য তাড়কা রাক্ষসীর পুত্র মারীচের সাথে পঞ্চবটী বনে উপস্থিত হলেন। মায়াবী মারীচ স্বর্ণ মৃগের রূপ ধারণ করে সীতার সম্মুখে ভ্রমন করতে লাগল। সীতা তখন রামকে ঐ স্বর্ণ মৃগ এনেদিতে অনুরোধ করায় শ্রীরাম লক্ষ্মণকে কুটীরে রেখে স্বর্ণমৃগের অনুসরন করে মৃগকে শরাঘাত করলেন, শরবিদ্ধ মারীচ শ্রীরামের স্বর অনুকরন করে- হা লক্ষ্মণ। হা সীতা বলে প্রাণ ত্যাগ করল। এই কাতরোক্তি শুনে শ্রীরামের বিপদ আসন্ন ভেবে সীতা লক্ষ্মণকে রামের অনুসন্ধান করতে প্রেরণ করলেন। এই সুযোগে রাবণ গুপ্ত স্থান হতে সীতাকে নিজের রথে চড়িয়ে লঙ্কার দিকে প্রস্থান করলেন। রাম ও লক্ষ্মণ কুটিরে ফিরে এসে কুটির শূন্য দেখে সীতা অন্বেষনে যাত্রাকরে, পথে মস্তকহীন কবন্ধকে হত্যা করলে তার অশরীরী আত্মা শ্রীরামকে বানররাজা সুগ্রীবের সাহায্য গ্রহণ করতে বললেন।
সুগ্রীব-ভ্রাতা বালীর হাত থেকে হৃতরাজ্য কিষ্কিন্ধ্যা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতিতে শ্রীরাম ও সুগ্রীবের মধ্যে মিত্রতা স্থাপিত হল। এর ফলে শ্রীরাম সীতা উদ্ধারের সমস্ত বানর কুল ও হনুমানের সাহায্য পেলেন। সীতাকে নিয়ে রাবন লঙ্কায় উপস্থিত হলে রাবনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিভীষণ সীতাকে মুক্তি দেবার জন্য অনুরোধ করেন। এতে রাবন ক্রদ্ধ হলে বিভীষণকে অপমানিত করলে বিভীষনের পরামর্শ অনুসারে শ্রীরাম-লক্ষ্মণ, রাবনকে সবংশে সংহার করে সীতাকে উদ্ধার করলেন ও বিভীষণকে লঙ্কার রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করলেন। সীতাদেবীর চরিত্র পরীক্ষা, অপবাদ খন্ডন এবং তার বিখ্যাত বংশের গ্লানি দূর করবার জন্য শ্রীরাম সীতাকে প্রজ্জ্বলিত চিতায় প্রবেশ করালেন। প্রথমে অগ্নিতে স্বর্ণ প্রতিমা সীতা বিলীন হয়ে গেলেন। তারপর অগ্নি সীতাকে শ্রীরামের নিকট ফিরিয়ে দিয়ে সীতাদেবীর সুচরিত্র ও সতীত্বের প্রমাণ করে দিলেন।
এই রূপে চৌদ্দ বছরের পর শ্রীরাম, লক্ষ্মণ ও সীতা অযোধ্যায় ফিরে এলে ভরত রামের হস্তে রাজ্যভার প্রত্যপর্ন করলেন। তখন রাম রাজ্য শাসন ও প্রজা পালন করতে লাগলেন। এই সময়ে তিনি শুনতে পেলেন দীর্ঘকাল বারনের গৃহে একাকী বন্দিনী থাকায় প্রজারা তার চরিত্র সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে নানারকম কুৎসা রটনা করছে। সীতাকে নিজে সতী জেনেও প্রজাদের মনস্তষ্টির জন্য শ্রীরাম লক্ষ্মণকে বললেন সীতাকে বাল্মীকির তপোবনে পরিত্যাগ করে আসতে। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও লক্ষ্মণ এই আদেশ পালন করলেন। তখন সীতা পূর্ণগর্ভা ছিলেন।
এরপর শ্রীরাম অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হলেন। সীতা বাল্মীকির আশ্রমে পরিত্যক্তা হবার পর তাঁর দুই জমজ পুত্রের জন্ম হয়। মহর্ষি এদের নাম দেন লব ও কুশ। ঋষি বাল্মীকি লব ও কুশের সাথে যজ্ঞঃস্থলে উপস্থিত হলেন। লব ও কুশের রামায়ন গান শুনে শ্রীরাম মুগ্ধ হলেন এবং এদের আকার ও অবয়ব দেখে নিজের পুত্র মনে বুঝতে পারলেন। ঋষি বাল্মীকির কাছে সীতার নিষ্ক¦লঙ্ক চরিত্রের কথা শুনে শ্রীরাম সীতাকে রাজ সভায় আনতে বলেন। মহর্ষি বাল্মীকি সীতাকে আবার অযোধ্যায় এনে বললেন “রাম, তুমি লোকাপবাদে ভীত,” এখন আজ্ঞাগকর, প্রজাপালক রাজারূপে শ্রীরাম প্রজাদের মনস্তষ্টির জন্য সীতাদেবীকে আবার অগ্নি পরীক্ষা দিতে বলেন। তখন সীতা অত্যন্ত ব্যথিতা হয়ে মাতা বসুধার কোলে স্থান পাবার জন্য প্রার্থনা করলেন। তৎক্ষনাৎ পৃথিবী দ্বিধা বিভক্ত হল এবং সীতা তার মধ্যে প্রবেশ করলেন। সীতাকে হারিয়ে শ্রীরাম বিষন্ন চিত্তে দিন কাটাতে লাগলেন। এমন সময় একদিন কাল পুরুষ তাঁর কাছে এসে গোপনে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা আরম্ভ করলেন। কিন্তু গোপন কথাবার্তার সময়ে কেউ সেখানে উপস্থিত হলে শ্রীরাম তাকে বর্জন করবেন, এইরূপ স্থির ছিল। লক্ষ্মণ প্রহরী রূপে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইতোমধ্যে সেখানে দুর্বাসা মুনি এসে উপস্থিত হয়ে রামের সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। লক্ষ্মণ সাক্ষাৎকারে বাধাদিলে লক্ষ্মণকে শাপ দিতে উদ্যত হলেন। তখন লক্ষ্মণ বাধ্য হয়ে শ্রীরামের নিকট উপস্থিত হলেন। শ্রীরাম সত্যবাক্য পালনের জন্য লক্ষ্মণকে বর্জন করতে বাধ্য হলেন। বর্জিত হবার পর লক্ষ্মণ সরযূ সলিলে আত্মা বিসর্জন করেন। প্রিয় ভ্রাতাকে বর্জন করবার পর শ্রীরাম শোকে ¤্রয়িমান হয়ে কুশকে কৌশলের ও লবকে উত্তর কৌশলের রাজা করে সরযুতে প্রবেশ করে যোগাবলম্বনে প্রাণত্যাগ করেন।
শ্রীরামচন্দ্র পুত্ররূপে, মিত্ররূপে, প্রভুরূপে, স্বমীরূপে, প্রজাপালক রাজারূপে ও মহাশূররূপে অতুলনীয় আদর্শ স্থাপন করে গিয়েছেন। এই সকল সদগুনাবলীর জন্য তিনি পুরুষোত্তম মূর্তিতে যুগ-যুগান্ত সকলের হৃদয়ে রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন।

সংগ্রহ ঃ
তীর্থের পথে পথে
স্বামী পরদেবানন্দ

Share This:

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.