পুরান ঢাকার ইফতারির ঐতিহ্যে ছেদ

রাজধানী পুরান ঢাকার তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ইফতারের বাজারে ছেদ এঁকে দিয়েছে করোনাভাইরাস। চকবাজারসহ পুরান ঢাকার হাঁকডাক আর হইহুল্লোরের ইফতারের বাজারে এখন শুনশান নীরবতা। প্রায় তিনশ বছর থেকে শায়েস্তা খানের আমল থেকে চলে আসা এই ইফতারির বাজার এলাকায় এখন ঘরে ঘরে বন্দি মানুষ।

প্রতি বছর রোজার ইফতারকে কেন্দ্র করে তিল ধারণের জায়গা থাকত না পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে। ইফতারির প্রাণ কেন্দ্র চকবাজারে দম নেওয়ার সময় পেতেন না দোকানিরা।

দুপুর থেকেই দোকানিরা বৈচিত্র্যে ভরপুর লোভনীয় সব ইফতার সামগ্রী থরে থরে সাজিয়ে বসতেন। বাহারি সেই ইফতার কিনতে ক্রেতাদেরও উপচেপড়া ভিড় থাকত। পুরান ঢাকার প্রতি ঘরে ঘরেই রমজানে ইফতারি বানানোর রেওয়াজ আছে। তারপরও পুরান ঢাকার বাসিন্দারা সবসময় বাইরের খাবারের প্রতি বেশি আকর্ষণবোধ করতেন। এজন্য বাহারি রকমের ইফতারির টান সেই শায়েস্তা খানের আমল থেকেই চলে আসছে পুরান ঢাকাবাসীর মধ্যে। তাই ঘরে তৈরির পাশাপাশি তারা বাজার থেকেও প্রচুর পরিমাণে ইফতার কিনতেন ।

এখানকার বাহারি ইফতারের মধ্যে থাকত শিকের সঙ্গে জড়ানো সুতি কাবাব, জালি কাবাব, শাকপুলি, টিকা কাবাব, আস্ত মুরগির কাবাব, মোরগ মসল্লাম, বঁটি কাবাব, কোফতা, চিকেন কাঠি, শামি কাবাব, শিকের ভারী কাবাব, ডিম চপ, কাচ্চি, তেহারি, মোরগ পোলাও, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, মোল্লার হালিম, নুরানি লাচ্ছি, পনির, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট, পেস্তা বাদামের শরবত, লাবাং, ছানামাঠা, কিমা পরোটা, ছোলা, মুড়ি, ঘুগনি, বেগুনি, আলুর চপ, পেঁয়াজু, আধা কেজি থেকে পাঁচ কেজি ওজনের জাম্বো সাইজ শাহি জিলাপিসহ নানা ধরনের খাবার।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান, ফার্মেসি হাসপাতাল বাদে অন্য সকল দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। গত ২৬ মার্চ থেকে ঘোষিত সাধারণ ছুটি তিন দফা বাড়িয়ে ৫ মে পর্যন্ত করা হয়েছে। এ সময়ে বিনা প্রয়োজনে কাউকে বাইরে না আসতে এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাচলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। চকবাজারের ইফতার বাজারের ক্রেতাদের ঢলের কারণে চলাচল করাই কষ্টকর হয়ে পড়ত। ফলে সেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই জনসমাগমের নিষেধাজ্ঞার কারণেই মূলত ঐতিহ্যবাহী এই ইফতার বাজারের এবার আর দেখা যাচ্ছে না।

করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে লকডাইনে ইফতারেরে ঐতিহ্যে ছেদ পরলেও এর পরিমাণ যে একেবারে শূন্যের কোঠায় এমন নয়। প্রথম রোজাতে কিছু দোকানিকে ছোট ছোট ডালা নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে। এমনি একজন বিক্রেতা বলেন, ইফতারি বানানো ও বিক্রি করা এক ধরনের নেশার মত। এই কাজ পারিবারিক ভাবে করে আসছি। এই বার না করেত পেরে অনেক খারাপ লাগছে। এরপরেও কিছু ইফতারি বাসা থেকে বানিয়ে এনে গলির মুলে বিক্রি করছি।

গত বিশ বছর ধরে চকবাজারে ইফতারি বিক্রয় করা আবুল হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ইফতারি বিক্রয় করা আমারদের জন্য উৎসব। সকাল থেকেই চলত আমাদের প্রস্তুতি। দুপুরের দিকে বসাতাম দোকান। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যার আগে আগে বেচা বিক্রি বেশি হত। মাগরিবের নামাজের আগেই সব ইফতারি শেষ হয়ে যেত। এবার দোকার না দিতে পেরে অলস সময় কাটছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরান ঢাকার চকবাজার, সদরঘাট, বাবুবাজার, নবাবপুর রোড, কোর্ট-কাচারি এলাকা, ওয়ারী, চাঁনখারপুল, মিটফোর্ড, আরমানীটোলাসহ অন্যান্য প্রায় সব এলাকায় রমজান মাসে ইফতারির সমারোহ চলত।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা শহরে। এর মধ্যে পুরান ঢাকাতেই এই ভাইরাসের সংক্রমণের পরিমাণ বেশি।

Share This: