দেবী দুর্গা উপাখ্যান

উপাধ্যক্ষ, উদয় শঙ্কর চক্রবর্ত্তী, জেনারেল সেক্রেটারী, রামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রাম: যিনি দশ হস্তে খড়গ, চক্র, গদা, তীর, ধনু, লগুড়, শঙ্খ, শূল, ভুশুন্ডী ও নরমুন্ড ধারন করেন; যিনি ত্রিনয়না, সর্ব প্রকার অলন্কারে সুশোভিতা এবং নীলকান্তমনিতূল্য প্রভাবিশিষ্টা; যাহার দশটি মুখ ও দশটি পদ; বিষ্ণু যোগ নিদ্যাগত হইলে মধু ও কৈটভ নামক অসুরদ্বয় বিনাশের জন্য ব্রহ্মা যাহাকে স্তবকরিয়া ছিলেন, আমি সেই মহাকালীর ধ্যান করি।
চৈত্রের বংশে উৎপন্ন সুরথ নামক একরাজা সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি হইয়াছিলেন। রাজা সুরথ প্রজাদিগকে ঔরসজাত পুত্রের ন্যায় যথানীতি পালন করিতেন। সেই সময় কোলা বিধ্বসী সবন নরপতিগন তাহার শত্রু হইলেন। সেই কোলা বিধ্বংসী সবনগনের সহিত অতি প্রবল শত্রুদিগের দন্ডদাতা রাজা সুরথের যুদ্ধ হইয়াছিল। অনন্তর মহাভাগ সুরথ প্রবল শত্রুগন কর্তৃক পরাভূত হইয়া নিজ রাজধানীতে প্রত্যাগমন পূর্বক স্বদেশের অধিপতি রহিলেন। অনন্তর স্বীয় রাজধানীতেও দুষ্ট, দুরশেষ ও বলবান অমাত্যগন অধুনা বলহীন রাজার ধন-ভান্ডার ও সৈন্যাদি অধিকার করিল। অনন্তর সেই রাজা রাজত্ব হারাইয়া মৃগ শিকার করিবার ছলে একাকী অশ^ারোহনে গভীর অরন্যে গমন করিলেন সুরথ সেই বনে শান্ত ভাবাপন্ন হিং¯্রপশু পরিপূর্ণ ও মুনি শিষ্য শোভিত দ্বিজবর মেধা মুনির আশ্রম দেখিতে পাইলেন। মুনি কর্তৃক সমাদৃত হইয়া সুরথ মুনিবরের আশ্রমে ইতস্তত: ভ্রমন পূর্বক কিছু সময় কাটাইলেন। রাজা সুরথ নিজ রাজ্য, ধন সম্পত্তি ও অন্যান্য বিষয়ে বহুক্ষন ধরিয়া ভাবিতে ছিলেন, এমন সময় তথায় আশ্রমের সমীপে একজন বৈশ্যকে দেখিতে পাইলেন, রাজা বৈশ্যকে জিজ্ঞাসা করিলেন হে ভদ্র আপনি কে, আপনার এখানে আগমেরন কারন্ বা কি এবং কেন আপনাকে সেন শোকাকুল ও দুর্মনা দেখাইতেছে? সেই বৈশ্য রাজার প্রীতিপূর্ণ বাক্য শ্রবনে বিনয়ারত হইয়া তাহাকে প্রত্যুত্তরে বলিলেন-আমি সমাধি নামক বৈশ্য এবং ধনবানের বংশে জাত। আমার অসাধু স্ত্রী-পুত্রগণ ধনলোভে আমাকে পরিত্যাগ করিয়াছে। স্ত্রী ও পুত্রগণ আমার ধন সম্পত্তি আত্মসাৎ করায় আমি ধনহীন হইয়াছি এবং আত্মীয় বন্ধুগন কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া স্ত্রী, পুত্রগণ ও স্বজন গণের শুভাশুভ কোন সংবাদ পাইতেছি না। রাজা সুরথ বলিলেন-সে ধনলোভী আত্মীয় ও স্ত্রী পুত্রগণ আপনাকে পরিত্যাগ করিয়াছে আপনার চিত্ত তাহাদের প্রতি কেন ¯েœহাসক্ত হইতেছে ? সমাধি বৈশ্য বললেন-আপনি আমার সম্বন্ধে যাহা বলিলেন তাহা সত্যই। কিন্তু আমি কি করি, আমার চিত্ত নিষ্ঠুর হইতেছে না। তাহাদের জন্য আমার দীর্ঘ নি:শ^াস পড়িতেছে এবং দু:চিন্তা হইতেছে। আমি কি করি, আমার প্রতি প্রীতিহীন পুত্রাদিতে আমার মন নির্দয় হইতেছে না। ইহাই মহা মায়ার অঘটন-ঘটন-পটীয়সী শক্তি, এই শক্তির প্রভাবে বস্তুর স্বরুপ সম্বন্ধে মানুষের ভ্রান্ত ধারনা হয় এবং নিত্য বস্তুর প্রতি প্রীতি না হইয়া আনিত্য বস্তুর প্রতি আসক্তি জন্মে। বৈশ্য সমাধি ও রাজা সুরথ উভয়ে মিলিত হইয়া মেধা মুনির সমীপে উপস্থিত হইলেন। সমাধি ও সুরথ উভয়েই মুনিকে যথাবিধি ও যথাযোগ্য সম্ভাষণ পূর্বক উপবেশন করিয়া তাহাকে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। রাজা সুরথ মেধা মুনিকে বলিলেন-হে ভগবান আপনাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করি। অনুগ্রহ পূর্বক তাহার উত্তর আমাকে উপদেশ করুন। হে মুনিবর, আমার চিত্ত আমার বশীভূত নয় বলিয়া হৃত রাজ্যাদিতে আমার মমতা এখন আছে। এই মমতায় আমার দু:খের কারন-ইহা আমি জানি। অজ্ঞের ন্যায় আমার সে মমতা রহিয়াছে। ইহার কারনকি? এই বৈশ্যও স্ত্রী পুত্রগণ কর্তৃক বঞ্চিত, অমাত্যদি কর্তৃক বর্জিত এবং আত্মীয় সকল কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়াছেন তথাপি তাহাদের প্রতি ইনি অতিশয় আসক্ত। এই প্রকারে ইনি ও আমি উভয়েই অত্যন্ত দু:খিত হইয়াছি। কারন স্ত্রী-পুত-রাজ্যাদি বিষয়ে দোষ দেখিয়াও তাহাদের প্রতি আমাদের চিত্ত মামতাযুক্ত হইয়াছে। হে মহামতি, রূপরসাদি বিষয় দোষমুক্ত-ইহা ইনি ও আমি জানি। তথাপি আমাদের এই মোহ কি হেতু হইতেছে ? এইরূপ মূঢ়তা বিবেকহীন ব্যক্তিরই হইয়া থাকে। মেধা ঋষি বলিলেন-হে মহামতে সমস্ত প্রাণীরই ইন্দ্রিঢগ্রাহ্য রূপরসাদি বিষয়ে জ্ঞান আছে এবং বিষয় সমূহ এই রূপে পৃথকভাবে তাহাদের জ্ঞানগোচর হয়। পেকোদি কোন কোন প্রাণী দিবসে দৃষ্টি শক্তিহীন; কাক প্রভৃতি অন্যান্য প্রাণী আবার রাত্রিতে অন্ধ। কেঁচো কোন কোন প্রাণী দিবা ও রাত্রিতে দৃষ্টি শক্তিহীন এবং বিড়াল ও রাক্ষসাদি কোন কোন প্রাণী দিবা ও রাত্রিতে সমান দৃষ্টি সম্পন্ন। সত্যই মানবগণের বিষয় জ্ঞান আছে। কিন্তু কেবল তাহারাই বিষয় জ্ঞান বান নহে। কারন পশু, পক্ষী, মৃগ ও মৎস্যাদি সকল প্রাণীরই বিষয়জ্ঞান আছে। আহার নিদ্রা, ভয় ও মৈথুনাদির জ্ঞান পশু ও মানুষ উভয়েরই সমান। কেবল মানুষের ধর্মবুদ্ধি আছে। কিন্তু পশুদের নাই। ধর্মহীন মানুষ পশুর সমান। তথাপি সংসারের স্থিতিকারিনী মহা মায়ার প্রভাবে জীবগন মোহরূপ গর্তে ও মমতারূপ আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়। এই মহামায়াই জগৎপতি বিষ্ণুর যোগ নিদ্রা (তমঃ প্রধানাশক্তি) এই জগতের সকল জীবকে মোহাচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছেন। অতএব এই বিষয়ে বিস্মিত হওয়া কর্তব্য নহে। সেই মহামায়া এই সমগ্র চরাচর জগৎ সৃষ্টি করেন। তিনি প্রসন্না হইলে মানুষকে মুক্তি লাভের জন্য অভীষ্ট বর প্রদান করেন। (কালিকা পুরানে ব্রহ্মা মদনকে যোগ নিদ্রার এইরূপ বর্ণনা দিতেছেন-যিনি ব্রহ্মান্ডের নি¤œ অন্তর ও অধোদেশে অধিষ্ঠিত থাকিয়া পুরুষকে তাহা হইতে পৃথক করিবার পর স্বয়ং অন্তর্হিত হন, তাহারই নাম যোগ নিদ্রা)। তিনি সংসার মুক্তির হেতুভূতা পরমা ব্রহ্মবিদ্যা-রূপিনী ও সনাতনী। তিনিই সংসারবন্ধনের কারন সরূপা অবিদ্যা এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু আদি সকল ঈশ^রের ঈশ^রী।
(কারন, তিনি সদ-সদাত্মিকা বা চিৎ-জড়াত্মিকা ব্রহ্মশক্তি) রাজা সুরথ জিজ্ঞাসা করিলেন-ভগবান, যাঁহাকে আপনি মহামায়া বলিতেছেন, সেই দেবী কে? মুনিবর, তিনি কিরূপে উৎপন্না হন এবং তাহার কারনই বা কি ? হে ব্রহ্মবিদ্বর, সেই মহামায়ার যেরূপ স্বভাব, যাদৃশ স্বরূপ এবং যে জন্য আবির্ভাব হয়, সেই সমুদয় আপনার নিকট শুনিতে ইচ্ছা করি। মেধা ঋষি বলিলেন-সেই মহামায়া নিত্যা; আবার এই জগৎ প্রকঞ্চই তাঁহার বিরাট মূর্তি। তিনি সর্বব্যাপী এবং নিত্যা হইলেও তাঁহার বহুপ্রকার আবির্ভাবের বৃত্তান্ত আমার নিকট শ্রবণ করুন। যখন তিনি দেবগনের কার্যসিদ্ধির নিমিত্ত আবির্ভূতা হন; স্বরূপত: নিত্যা হইলেও তিনি তখন পৃথিবীতে উৎপন্না, এইরূপ অভিহিত হন।
প্রলয়কালে (ব্রহ্মার দিবাবসানে) পৃথিবী এক বিরাট কারন-সমুদ্রে পরিনত হইলে যখন ভগনা প্রভু বিষ্ণু অনন্তনাগকে শয্যারূপে বিস্তৃত করিয়া যোগনিদ্রায় নিমগ্ন হইলেন-তখন মধু ও কৈটভ নামে প্রসিদ্ধ ভয়ঙ্কর অসুরদ্বয় বিষ্ণুর কর্নমল হইতে উৎপন্ন হইয়া ব্রহ্মাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইল।
বিষ্ণুর নাভি-পদ্মে অবস্থিত সেই প্রজাপতি প্রভু বিষ্ণুকে যোগনিদ্রামগ্ন এবং উগ্র অসুরদ্বয়কে সমীপে দেখিয়া বিষ্ণুর জাগরনের নিমিত্ত তেজঃস্বরুপ বিষ্ণুর নয়নাশ্রিতা অতুলাতামসী-শক্তি বিশে^শ^রী, জগদ্ধাত্রী, স্থিতি-সংহারকারিনী ভগবতী-সেই যোগনিদ্রার স্তব করিতে লাগিলেন।
ব্রহ্মা বলিলেন-নিত্যে, অক্ষরে, আপনিই দেবোদ্দেশ হবির্দানের স্বাহা মন্ত্ররূপা। আপনিই পিতৃলোকের উদ্দেশে দ্রব্যদানের স্বধামন্ত্ররূপা। আপনি দেবাহবানের বষট্মন্ত্র স্বরূপা ও উদাত্তদিস্বর রূপা। আপনিই অমৃতরূপা এবং অ-উ-ম ত্রিবিধ মাত্রারূপে অবস্থিতা প্রনবরূপা। বিশেষ রূপে যাহা অনুচ্চার্য। নির্গুনা বাতুরীয়া তাহাও আপনি। হে দেবী, আপনি গায়ত্রী মন্ত্ররূপা এবং আপনি পরিমানহীন শ্রেষ্ঠা শক্তি ও দেবগনের আদি মাতা। হে দেবি আপনিই এই জগৎ-ধারন করিয়া রহিয়াছেন। আপনি এই জগৎ সৃষ্টি করেন, আপনিই ইহা পালন করেন এবং সর্বদা প্রলয়কালে আপনি ইহা সংহার করেন। হে জগৎ স্বরূপা, আপনি এই জগতের সৃষ্টিকালে সৃষ্টি শক্তিরূপা। পালনকালে স্থিতি শক্তিরূপা এবং প্রলয়কালে সংহার শক্তিরূপা। আপনি মহা বাক্যলক্ষনা ব্রহ্মবিদ্যা ও সংসৃতিকর্ত্রী মহামায়া। আপনি মহতী মেধা, মহতী স্মৃতি ও মহামোহ আপনি মহতী দেবশক্তি এবং মহতী অসুর শক্তি। আপনি সর্বভূতের প্রকৃতি ও ত্রিগুনের পরিমান বিধায়িনী। আপনি কালরাত্রি, মহারাত্রি ও দুষ্পপরিহারা মানুষীরাত্রি। আপনি লক্ষ্মী, ঈশ^র শক্তি, হ্্রী, নিশ্চয়ত্মিকা বুদ্ধি। আপনিই লজ্জা, পুষ্টি, তুষ্টি, শান্তি ও ক্ষান্তি।
আপনি খড়গধারিনী, ত্রিশূল ধারিনী ভয়ঙ্করী মহাকালী দশভূজা এবং দশ হস্তে দশ প্রহরন ধারিনী। আপনি সর্ব প্রধানা দেবী এবং পরমেশ^রের মহাশক্তি। হে দেবি আপনি এবং বিধ অলৌকিক স্বীয় মহিমায় সংস্তুতা হইয়া মধু ও কেটভ নামক এই দুর্জয় অসুরদ্বয়কে মোহিত করুন। মেধা ঋষি বলিলেন-তখন তথায় তামসী দেবী ব্রহ্মা কর্তৃক সংস্তুতা হইয়া মধু ও কৈটভের বিনাশার্থ এবং বিষ্ণুর যোগনিদ্রাভঙ্গেঁর জন্য বিষ্ণুর নেত্র, মুখ, নাসিকা, বাহু, হৃদয় এবং বক্ষ:স্থল হইতে নির্গত হইয়া ব্রহ্মার দৃষ্টি গোচর হইলেন। অনন্তর সম্যগরূপে গাত্রোস্থান পূর্বক জগৎপ্রভু ভগবান বিষ্ণু পাঁচ হাজার বৎসর তাহাদের সহিত বাহুযুদ্ধ করিলেন। অনন্তর সেই অতিবলগর্বিত অসুরদ্বয় মহামায়অর দ্বারা বিমোহিত হইয়া বিষ্ণুকে বলিল। “আমাদের নিকট বর প্রার্থনা করুন”। মেধা ঋষি বলিলেন-মহামায়া কর্তৃক এইরূপে বিমোহিত অসুরদ্বয় মধু ও কৈটভ তখন সমগ্র বিশ^ কারন জলে মগ্ন দেখিয়া কমললোচন বিষ্ণুকে বলিল-আপনার যুদ্ধে আমরা উভয়ে প্রীতি হইয়াছি। ভগবান বিষ্ণু বলিলেন তোমরা আমার হাতে বধ্য হও। ইহার আমার অভিপ্রায়। আপনার হস্তে আমাদের মৃত্যু শ্লাঘ্য। পৃথিবীর যে স্থান জল প্লাবিত হয় নাই তথায় আমাদের উভয়কে বিনাশ করুন। মেধা ঋষি বলিলেন-শঙ্খ, চক্র ও গদাবীরী ভগবান বিষ্ণু ‘তাহাই হউক’ বলিয়া অসুরদ্বয়ের মস্তক জঙ্ঘাদেশে রাখিয়া সুদর্শনচক্র দ্বারাই ছেদন করিলেন। এই মহামায়া উক্ত রূপে ব্রহ্মা কর্তৃক সংস্তুতা হইয়া স্বয়ং অবির্ভূতা হইলেন, দেবী ভাগবত মতে অসুরদ্বয় গতায়ু হইয়া পতিত হইবা মাত্র সেই প্রলয় প্লাবিত করেন সমুদ্র তাহাদের মেদদ্বারা পরিপূর্ণ হইল। সেই জন্য পৃথিবীর এক নাম মধু বধের জন্য বিষ্ণুর নাম মধুসুদন। দেবী রজ:শক্তি ব্রহ্মারূপে ক্রিয়াশীল। মেধা ঋষি বলিলেন-পূর্বকালে যখন মহিষাসুর অসুর গনের রাজা এবং ইন্দ্র দেবগনের অধীশ^র ছিলেন। তখন পূর্ণ একশত বৎসর দেবগণ ও অসুরগণের মধ্যে যুদ্ধ হইয়াছিল। সেই যুদ্ধে মহাবীর অসুরগণ দেব সৈন্য সমূহকে পরাজিত করিল এবং মহিষাসুর দেবগণকে পরাভূত করিয়া স্বর্গের অধিপতি হইল। (কালিকা পুরান মতে মহিষাসুর রম্ভা সুরের তনয় এবং শিবাংশে জাত। রম্ভাসুরের তপস্যায় প্রসন্ন হইয়া মহাদেব তাহাকে অমর পুত্র লাভের বর প্রদান করন। মহিষাসুর তপস্যার দ্বারাদেবীর নিকট দেবীর সায়ুজ্য প্রার্থনা করিয়াছিল। দেবী ভাগবতমতে মনুর দুই পুত্র রম্ভ ও করম্ভ অমরত্ব লাভের জন্য কঠোর তপস্যা করে। করম্ভাসুর নদীজলে দাড়াইয়া তপশ্চর্যার রত হয়। দেবরাজ ঈন্দ্র চিন্তিত হইলেন। তিনি কুম্ভীর রূপে করম্ভকে আক্রমন ও নিহত করিলেন। ভ্রাতার মৃত্যু সংবাদে রম্ভাসুর ব্যথিত হইয়া কঠোর মত তপস্যায় মগ্ন হইল। তাহার তপস্যায় প্রসন্ন হইয়া ব্রহ্মা তাহাকে অমরত্ব-বর দান করেন। অমরত্ব লাভে উৎফুলন্ন হইয়া রম্ভ গৃহভিমুখে গমন কালে এক সুন্দরী মহিষীকে বিবাহ করে। কিছুদূর অগ্রসর হইয়া নবদম্পতী অন্য এক অসুর কর্তৃক আক্রান্ত হয়। পত্মীর প্রান রক্ষার জন্য রম্ভ নিহত হইল। রম্ভপত্মী মহিষীর গর্ভে মহিষাসুরের জন্ম হয়। মহিষাসুর তপস্যা দ্বারা ব্রহ্মার নিকট অমরত্ব লাভ করে)। তত অনন্তর পরাভূত দেবগন প্রজাপতি ব্রহ্মাকে অগ্রবর্তী করিয়া শিব ও বিষ্ণুর সমীপে গমন করিলেন। দেবগণ তাহাদের পরাভব-কাহিনী মহিষাসুরের দৌরাতেœ্য যে ঘটিয়াছিল সেইরূপ বিষ্ণু ও শিবের নিকট বর্ণনা করিলেন। সূর্য, ইন্দ্র, অগ্নি, বায়ু, চন্দ্র যম, বরুন ও অন্যান্য দেবতা ও ব্রহ্মর্ষিগণের অধিকার সমূহে মহিষাসুর নিজেই অধিষ্ঠিত হইয়াছে। সেই দুরাত্মা মহিষাসুর কর্তৃক স্বর্গ হইতে দূরীকৃত হইয়া দেবগণ মনুষ্যগনের ন্যায় পৃথিবীতে বিচরণ করিতেছে। দেবশত্রু অসুরগণের এই সমস্ত দৈৗরাত্ম্য আপনাদের নিকট বলিলাম এবং আমরা আপনাদের শরনাপন্ন হইলাম। এখন আপনারা উভয়ে মহিষাসুরের বধোপায় বিশেষ রূপে চিন্তা করুন। ব্রহ্মা প্রমুখ দেবগণের মুখে এই সকল কথা শুনিয়া মধুসূদন ও মহাদেব অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইলেন এবং ভ্রু-কুঞ্চনে তাহাদের মুখ মন্ডল ভীষনাকার ধারন করিল। অনন্তর অতি ক্রোধান্বিত বিষ্ণুর এবং পরে ব্রহ্মা ও শিবের বদন হইতে মহাতেজ নি:সৃত হইল। ইন্দ্রাদি অন্যান্য দেবগনের শরীর হইতে সুবিপুল তেজ নির্গত হইয়া একত্রমিলিত হইল। পুরানান্তর প্রসিদ্ধ কাত্যায়নাশ্রমে দেবগণ সেই সুদীপ্ত তেজ:পুঞ্জকে দিগন্তর ব্যাপী জলন্ত পর্বতের ন্যায় অবস্থিত দেখিলেন। অনন্তর সকল দেবতার শরীর হইতে সজ্ঞাত ত্রিলোকব্যাপী অনুপম তেজারাশি একত্র হইয়া এক নারী মূর্তি ধারন করিল। শম্ভুর তেজে সেই দেবী মূর্তির মুখ, যমের তেজে তাহার কেশ পাশ এবং বিষ্ণুর তেজে তাহার বাহু সমূহ উৎপন্ন হইল। চন্দ্র তেজে তাহার স্তনযুগল, ইন্দ্রতেজে তাহার শরীরের মধ্যভাগ, বরুন তেজে তাহার জক্সমা ও ঊরুদ্বয় এবং পৃথিবীর তেজে তাহার নিতম্ব উদ্ভুত হইল। ব্রহ্মার তেজে তাহার পদযুগল, সূর্যের তেজে তাহার পদাঙ্গুলি সকল এবং কুবেরের তেজে তাহর নাসিকা উৎপন্ন হইল। দক্ষাদি প্রজাপতিগনের তেজে তাহার দন্ত সকল এবং বহ্নির তেজে তাহার তিনটি চক্ষু উৎপন্ন হইল। সন্ধ্যাদেবীদ্বয়ের তেজে তাহার ভ্রু যুগল ও বায়ুর তেজে কর্ণদ্বয় এবং বিশকর্মাদি অন্যান্য দেবতাগণের তেজ:পুঞ্জ হইতে দূর্গাদেবীর আবির্ভাব হইল। অনন্তর সমস্ত দেবতার তেজরাশি সম্ভুতা মহাদেবীকে দেখিয়া মহিষাসুর পীড়িত অমরগন আনন্দিত হইলেন। ত্রিশূল ধারী মহাদেব স্বীয় শূল হইতে ত্রিশূল বিষ্ণু দিলেন সুদর্শন চক্র, বরুনদেব শঙ্খ, অগ্নিদেবের শক্তি এবং পবনদেব একটি ধনু ও দুইটি বান পূর্ণ তুনীর তাহাকে দান করিলেন। দেবরাজ সহ¯্রলোচন ইন্দ্র দিলেন স্বীয় বজ্র এবং ঐরাবত নামক স্বর্গগজের গলদেশস্ত ঘন্টা। মৃত্যুরাজ যম দিলেন স্বীয় কালদন্ড, জল দেবতা বরুন স্বীয় পাশ, প্রজাপতি ব্রহ্মা রুদ্রাক্ষ-মালা ও কমন্ডুল দেবীকে দান করিলেন। দূর্গা দেবীর সমস্ত লোমকূপে দিবাকর নিজ কিরন রাশি এবং নিমেষাদিকালাভিমানিনী দেবতা একটি প্রদীপ্ত খড়ক ও একটি উজ্জল ঢাল তাহার হস্তে প্রদান করিলেন। ক্ষীর সমুদ্র তাহাকে উজ্জল মুত্তাহার, চিরনূতন বস্ত্রযুগল দিব্য চুড়ামনি, দুইটি কুন্ডল এবং হস্ত সমূহের বলয়গুলি, শুভ্র ললাট ভূষণ, সকল বাহুতে অঙ্গদ (বাজু) নির্মল নূপুর, অত্যুত্তম কন্ঠভূষণ এবং সমস্ত অঙ্গুলিতে শ্রেষ্ট অঙ্গুরী প্রদান করিলেন। দেবশিল্পী বিশ^কর্মা অভেদ্য কবচ প্রদান করিলেন। সমুদ্র তাহার শিরে অম্লান পদ্মের একটি মালা, তাহার বক্ষে তাদৃশ অপর একটি মালা এবং তাহার হস্তে একটি পরম সুন্দর পদ্ম দান করিলেন। গিরিরাজ হিমালয় বাহন স্বরূপ সিংহ ও বিবিধ রতœ এবং কুবের সদা সুরা পূর্ণ একটি পান পাত্র তাহাকে দিলেন, যে নাগরাজ বাসুকি এই পৃথিবী ধারন করেন, তিনি দিলেন মহাসনি শোভিত একটি নাগহার অন্যান্য দেবগন কর্তৃকও অলঙ্কার এবং অস্ত্রাদি দ্বারা সুসজ্জিতা হইয়া জগন্মতা দূর্গা বারংবার অট্টহাস্য ও হুঙ্কার করিতে লাগিলেন। তাহার অপরিমিত অতি মহান ঘোর গর্জনে সমগ্র আকাশ পরিপূর্ণ হইল এবং ভীষণ প্রতিধ্বনি উঠিল। সেই সিংহনাদে চতুর্দশ ভুবন, সংক্ষুব্দ, সপ্ত সমুদ্র কম্পিত এবং পৃথিবী ও পর্বত সকল বিচলিত হইল। দেবগণ আনন্দে সিংহবাহিনীর জয়ধ্বনি করিলেন এবং মুনিগন ভক্তিভরে নতদেহ হইয়া দেবীকে স্তব করিতে লাগিলেন।
সেই অসুরগন সমস্ত ত্রিলোকবাসীকে সন্ত্রস্ত দেখিয়া সৈন্য সমূহ সসজ্জিত এবং অস্ত্র শস্ত্রাদি উদ্যত করিয়া সমুঙ্খিত হইল। মহিষাসুর ক্রোধে আঃ একি! এই কথা বলিয়া অসংখ্য অসুরের সহিত সেই শব্দাভিমুখে ধাবিত হইল। অনন্তর যাহার অঙ্গঁজ্যোতিতে ত্রিভূবন আলোকিত যাহার পদ ভরে পৃথিবী অবনত, যহার ধনুকের টঙ্কারে পাতাল পর্যন্ত সপ্ত নি¤œলোক আকুলিত, যিনি সহ¯্র হস্তে দশ দিক পরিব্যাপ্ত করিয়া অবস্থিা এবং গগন স্পর্শী মুকুট পরিহিতা, সেই দূর্গা দেবীকে মহিষাসুর দর্শন করিল। অনন্তর দৈত্য সেনাপতি চিক্ষুর নামক মহাসুর অসুর সৈন্য সমূকে দেবী কর্তৃক নিহত হইতে দেখিয়া ক্রোধে অম্বিকার সহিত যুদ্ধ করিতে গম করিল। জলদ যেমন জলবর্ষন দ্বারা সুমেরু পর্বতের শিখর দেশে আচ্ছন্ন করে তদ্রুপ চিক্ষুরাসুর যুদ্ধে দেবীকে শর বৃষ্টি দ্বারা আচ্ছন্ন করিল। অনন্তর দেবী চিক্ষুরের বান সমূহ স্বীয় বানের দ্বারা ছিন্ন করিয়া অশ^গুলি ও তাহাদের চালক গনকেও বানাঘাতে বধ করিলেন এবং তৎক্ষনাৎ তাহার ধনু ও অত্যুচ্চ রথ-ধ্বজা ছেদন পূর্বক ছিন্নধনু চিক্ষরের সর্বাঙ্গঁ বান বিদ্ধ করিলেন। সেই অসুর ছিন্নধনু, রথশুন্য, অশ^হীন হইয়া খড়গ ও ঢাল ধারণ পূর্বক দেবীর দিকে ধাবিত হইল। অতি বেগবান অসুর তীক্ষèধার খড়গ দ্বারা সিংহকে মস্তকে আঘাত করিয়া দেবীরও বাম হস্তে আঘাত করিল। খড়গ দেবীর হস্তে লাগিয়া ভগ্ন হইল। তখন সেই অসুর ক্রোধে রক্তচক্ষু হইয়া শূল গ্রহণ করিল। অনন্তর মহাসুর চিক্ষুর আকাশস্থ সূর্য বিশে^র ন্যায় উজ্জল সেই শুলটি ভদ্রকালীর প্রতি নিক্ষেপ করিল। দেবী সেই শূল আসিতে দেখিয়া স্বীয় শূল নিক্ষেপ করিলেন। দেবীর শূলে ঐ শূল এবং অসুর ও শতধা খন্ডিত হইল। মহিষাসুরের সেনাপতি মহাবীর চিক্ষুর নিহত হইলে দেবশত্রু চামরা সুর, উদগ্রাসুর, করালসুর, তা¤্রাসুর, অন্দকাসুর ও দেবীর শক্তি-অস্ত্র নিক্ষেপ করিল। দেবী তৎক্ষনাৎ তাহা হুঙ্কার নাদে প্রতিহত ও নিস্প্রভ করিয়া ভূতলে পাতিত করিলেন।
এইরূপে স্বীয় সৈন্য বিনষ্ট হইলে মহিষাসুর মহিষাকৃতি ধারণ পূর্বক দেবীর নি:শ^াসোৎপন্ন সৈন্যগনকে ভয় দেখাইতে লাগিল। মহিষাসুর দেবী সৈন্যের কতকগুলিকে মুখাঘাতে, খুরাঘাতে, শৃঙ্গাঘাতে বিদীর্ণ করিল। মহিষাসুর দেবী প্রথম সৈন্য সমূহ সংহার পূর্বক তাহার বাহন সিংহকে বিনাশ করিবার জন্য ছুটিল। তখন অম্বিকা দেবী ক্রদ্ধা হইলেন। মহাকল অসুরও ক্রোধে ধুরদ্বারা ভূতল বিদীর্ণ করিয়া স্বীয শৃঙ্গদ্বয় দ্বারা উচ্চ পর্বত সকল দেবী প্রতি নিক্ষেপ পূর্বক গর্জন করিতে লাগিল। পৃথিবী তাহার সবেগ গমনে নিপীড়িতা হইয়া বিশির্না হইল এবং সমুদ্র তাহার লাঙ্গুল তাড়নে উদ্বেলিত হইয়া সর্বস্থান প্লাবিত করিল। এইরূপে ক্রোধে প্রজ্জলিত মহিষাসুরকে সবেগে আসিতে দেখিয়অ তাহার বধের জন্য চন্ডিকা ক্রদ্ধা হইলেন। চন্ডিকাদেবী সেই মহাসুরের উপর পাশ নিক্ষেপ পূর্বক তাহাকে বন্ধন করিলেন। সেও মহাযুদ্ধে পাশবদ্ধ হইয়অ মহিষাকৃতি ত্যাগ করিল। তখন সেই অসুর তৎক্ষনাৎ সিংহরূপ ধারন করিল এবং সেই অম্বিকা তাহার মস্তক ছেদন করিলৈন অমনিসে খড়কধারী পুরুষরূপে আবির্ভূত হইল। দেবী শীঘ্রই খড়গ ও ঢাল সহিত সেই পুরুষকে বানদ্বারা ছেদন করিলেন। তখন সে এক বৃহৎ হস্তীর আকার ধারন করিল। মহাহস্তী শুন্ডদ্বারা দেবীবাহন সিংহকে আকর্ষন পূর্বক গর্জন করিতে লাগিল। দেবী খড়গের দ্বারা তাহার মুন্ডটিকে আকর্ষনের সময়েই কাটিয়া ফেলিলেন।
অতপর মহাসুর পুনরায় মহিষাকৃতি ধারন করিয়া পূর্ববৎ স্থাবর-জঙ্গমাত্মক ত্রিভুবন বিক্ষুব্দ করিল। অনন্তর জগন্নমাতা চন্ডিকা ক্রদ্ধা হইয়া পুন: পুন: দিব্য সুরাপান করিতে লাগিলেন এবং তাহাতে আরক্ত নয়না হইয়অ অট্রহাস্য করিলেন। অসুরও দৈহিক বল মানসিক শক্তির গর্বে উদ্ধত হইয়া গর্জন করিল এবং শৃঙ্গঁযুগল দ্বারা চন্ডিকার প্রতি পর্বত সকল নিক্ষেপ করিতে লাগিল। অসুর কর্তৃক নিক্ষিপ্ত পর্বত সকল শরদ্বারা চুর্ন করিতে করিতে মদ্য পানে অতিশয় রক্ত বদনা চন্ডিকাদেবী বিজড়িত স্বরে মহাসুরকে বলিলেন-রে মুঢ়, মতক্ষন আমি মধু পান করি ততক্ষন তুই গর্জন কর। আমি তোকে বধ করিলে ইন্দ্রাদি দেবগন এই স্থানে শীঘ্রই আনন্দ ধ্বনি করিবেন। মেধা ঋষি বলিলেন-চন্ডিকাদেবী এই কথা বলিয়া লক্ষ প্রদান পূর্বক মহিষাসুরের উপর চড়িয়া তাহার কন্ঠদেশ পদদ্বারা নিপীড়ন করিয়া তাহার বক্ষে শূলাঘাত করিলেন। অনন্তর মহিষাসুর ও চন্ডিকার পদদ্বারা দৃঢ়ভাবে আক্রান্ত হইয়া নিজ মুখ হইতে অন্য মহাসুর রূপে অর্ধমাত্র বহির্গত হইল। তখন দেবীর উগ্রতেজে স্তম্ভিত, হইল। এই মাহাসুর অর্ধমাত্র নির্গত হইয়াই দেবীর সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে দেবীর খড়গাঘাতে ছিন্ন মস্ত হইয়া ধরাশায়ী হইল। তখন সেই সকল অসুর সৈন্য হাহাকার করিতে করিতে পলায়ন করিল এবং দেবতাগন অতিশয় আনন্দিত হইলেন।
ভগবান সহ¯্রবদন বিষ্ণু, ব্রহ্মা ও শিব যাঁহার অনুপম প্রভাব ও শক্তি বর্ণনা করিতে অক্ষন, সেই চন্ডিকা সমগ্র বিশ^-পরি পালনের নিমিত্ত এবং আমাদের অসুর ভীতি বিনাশের জন্য ইচ্ছা করুন, ইন্দ্র প্রমুখ দেবতাগনের শক্তিপুঞ্জের ঘনীভূত মূর্তি সে দেবী স্বীয় মায়া শক্তির প্রভাবে এই সমগ্র বিশে^ আরাধ্যা সেই আম্বিকাকে আমরা ভক্তি পূর্বক প্রণাম করি তিনি আমাদের সর্ব বিধ মঙ্গঁল বিধান করুন।
“যা দেবী সর্ব ভূতেষূ শক্তিরূপেন সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।”

সহায়ক গ্রন্থ
শ্রী শ্রী চন্ডী
পুজ্যপদ-স্বামী-জগদীশ^রানন্দ জী মহারাজ

Share This: