জয়তুঃ বীর বিবেকানন্দ

উদয় শঙ্কর চক্রবর্তীঃ উপমহাদেশের মানুষ যখন একদিকে দারিদ্র, অশিক্ষা, পরাধীনতা ও আর্থসামাজিক অস্থিরতাদ্বারা নিপীড়িত আর অন্যদিকে ধর্মীয় গোড়ামি, নৈতিক দীনতা ও আত্মিক জড়তায়, তখন বিপুল জন গোষ্ঠীর সার্বিক মুক্তির জন্য সংস্কার অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। রাজা রামমোহন রায় যে সংস্কার কর্মের শুভ সুচনা করেছিলেন এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয় কুমার দত্ত, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখের চিন্তা ও কর্মের সংস্পর্শে অগ্রবর্তী হয়েছিল, সেই সংস্কারেরই যুগোপযোগী এক নতুন বার্তা তথা এক নতুন জীবনদর্শ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রকৃত মানবতার উদ্যোগতা স্বামী বিবেকানন্দ। স্বামী বিবেকানন্দ অন্যান্যদের মতো অহেতুক, অতীন্দ্রিয় প্রেম (যার লক্ষ্যবস্তু যতটুকু না ছিল মাটির মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশ ছিল অমৃত লোকের দেবদেবী) সাধনার পরামর্শ দেননি: স্বামী বিবেকানন্দ প্রচারিত প্রেম ছিল যথার্থই, এমন মানব কেন্দ্রিক প্রেম যা মানুষের মধ্যে খুঁজে পায় তার সৃষ্টিকর্তাকে। তাঁর বহুল প্রচারিত এই বানীটি তাই আজ কোনো বিশেষ ধর্মের বানী নয়, মানব ধর্মের অন্যতম স্তবক।
“বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুজিছ ঈশ্বর?
জীবে প্রেম করে যেই জনে, সেই জনে সেবিছে ঈশ্বর”।
১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি; ২৯ পৌষ ১২৬৯ বঙ্গাব্দ; সোমবার, সকাল ৬টা-৩৩ মিনিট-৩৩ সেকেন্ড। গৌর মোহন মুখার্জী লেন, কলকাতার শিমুলিয়া পল্লীর সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে তাঁর জন্ম বাল্য নাম নরেন্দ্র নাথ দত্ত (বিলে) পিতা শ্রী বিশ্বনাথ দত্ত ও মাতা ভূবনেশ্বরী দেবী। স্বামীবিবেকানন্দ একজন ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ, বিশ্ব মানবতাবাদের প্রবক্তা, বাঙালির কৃতী সন্তান। শৈশবে তিনি ছিলেন মা-বাবা, প্রতিবেশীদের আদরের বিলে। স্কুল কলেজে গিয়ে তার আটপোরে নাম হলো নরেন্দ্র নাথ দত্ত। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি কলকাতার খ্যাতনামা আইনজীবী পরিবারে তাঁর জন্ম, অদ্ভুত দুরন্ত বালক শৈশব থেকেই কথা ও কাজে সত্যনিষ্ঠ, সমবয়সীদের নেতা, দী-দুঃখীদের প্রতি সহৃদয়। দর্শন শাস্ত্রের প্রতিভাবান ছাত্র নরেন্দ্রনাথ যুক্তি প্রমানের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমানের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অবশেষে শ্রী রামকৃষ্ণের মহা প্রয়ানের পর নরেন্দ্রনাথ গুরু ভাইদের নিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন, এই ব্রত ধারন করে, তিনি হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ পরি ব্রাজকরূপে বেরিয়ে পড়েন নি:সঙ্গ অবস্থায়। দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ভ্রমন করে জানতে পারলেন দেশবাসীর দুঃখ দুর্দশা কত তীব্র। তাই তিনি আহ্বান করলেন-“জীবন ক্ষনস্থায়ী, আত্মা অবিনাশী, আর মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন এসো এ পৃথিবীতে কোন চিহ্ন রেখে যাও। এসো মানুষ হও—। তোমারা কি মানুষকে ভালবাসো? তোমরা কি দেশকে ভালবাসো? তাহলে এসো ভালো হবার জন্য, উন্নত হবার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করি।” যুব সমাজের প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের জ্ঞানদীপ্ত আশীর্বানী-“যদি ইচ্ছা হয় তো সম্পূর্ণ অকপট, সম্পূর্ণ নি:স্বার্থ, সর্বোপরি পবিত্র হয়ে আমাকে অনুসরণ করো। আমার আশীর্বাদ তোমাদের ওপর রয়েছে। স্বামীজী আরও বলেছেন-“হে যুবকবৃন্দ, দরিদ্র, অজ্ঞ ও অত্যাচার নিপীড়িত জনগনের জন্য তোমাদের প্রাণ কাঁদুক। প্রাণ কাঁদিতে কাঁদিতে হৃদয় রুদ্ধ হউক। মস্তিস্ক ঘুর্ণায়মান হউক; তোমাদের পাগল হবার উপক্রম হউক, আমি তোমাদের নিকট এই গরীব, অজ্ঞ, অত্যাচার পীড়িতদের জন্য এই সহানুভূতি, এই প্রাণপন চেষ্টার দায় স্বরূপ অর্পন করিতেছি।

সমস্ত কিছু মিলে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ছিল বীরত্বে ভরা। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। এই বিশেষ বীরত্ব বিরল ছিল তাঁর চতুস্পার্সে। তিনি যে পরাধীন ভারতবর্ষে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন সেখানে নত হয়ে থাকাই ছিল স্বাভাবিক, অবনত অবস্থাতেই লোকে যতটা সম্ভব সৃষ্টিশীলতা বজায় রাখতে চাইতো। ক্লীবতায় আচ্ছন্ন ভারতবর্ষে বীরত্বের যে কত বেশি প্রয়োজন সে তিনি মর্মে বুঝে ছিলেন। যদি সবদিকে সুবিধা হয়, তবে অতি কাপুরুষ ও বীরের ভাব ধারন করে। মুর্খ দিগকেও যদি প্রশংসা করা যায়, তবে তাহারাও কার্যে অগ্রসর হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ নিছক তন্ত্রমন্ত্রে কিংবা কেবল মাত্র নির্বিকল্প সমাধীতে বিশ্বাসী ছিলেন না, বিশ্বাসী ছিলেন সফল কর্মানুষ্ঠানে। তাই তিনি স্বামী বিবেকানন্দকে উৎসাহিত করেছিলেন কর্মযোগ অনুশীলনে। কথিত আছে যে, কঠোর তপা নরেন্দ্রনাথকে একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ যখন ডেকে জিজ্ঞেস করেন তিনি কি চান, উত্তরে নাকি তিনি নির্বিকল্প সমাধি যোগে সচ্ছিদানন্দ সাগরে ডুবে থাকার ইচ্ছা করেন। তাতে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে স¯েœহে ভৎর্সনা করেছিলেন এভাবে “ছি! ছি! তুই এত বড় আধার। আমি ভেবেছিলাম তুই বটগাছের মত হবি, তোর ছায় হাজার হাজার লোক আশ্রয় পাবে, তা না হয়ে তুই কিনা নিজের মুক্তি চাস? না-না অতছোট নজর করিসনি”। এ উপদেশই দার্শনিক তার্কিক উদ্ধত নরেন্দ্রনাথকে পরিনত করেছিল গুরুভক্ত, সঠিক ও মানব মিত্র বিবেকানন্দে। যিনি সংস্কারের জন্য উপমহাদেশের বিশাল জনসংখ্যাকে পরিনত করতে চাইলেন এক প্রবল শক্তিতে। তাই তিনি বললেন আমাদের দরকার পারমানবিক শক্তির চেয়ে পরম মানবিক শক্তি-সকলকে ভালবাসার শক্তি। এ শক্তি পারমানবিক শক্তিকে কল্যাণমুখী করে মানব সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, ধ্যানমগ্নতা ছিল স্বামীজীর এক সহজাত প্রবনতা। তাই তিনি সব জাগতিক লোভ-লাসার উর্দ্ধে অবস্থান করতেন। যে টাকার নামে পাগলের মুখেও জল আসে, নারীর সৌন্দর্যে বিশ্ব বিজয়ীরা আত্ম সমর্পন করে তাকে তিনি গ্রাহ্যের মধ্যেও আনেনি। স্বামী বিবেকানন্দ সেই কৌশল আমাদের শিখিয়েছে-“ওঠ, জাগো”, আপনাদিগকে দূর্বল ভেবে তোমরা যে মোহে আচ্ছন্ন হয়ে আছ, তা দূর করে দাও। কেউই প্রকৃতপক্ষে দুর্বল নয়-আত্মা অনন্ত সর্ব শক্তিমান ও সর্বজয়া। ওঠ নিজের স্বরুপ প্রকাশিত কর, তোমার ভিতরে যে ভগবান রয়েছেন তাকে উচ্চঃস্বরে ঘোষণা কর। তোমার নিজ নিজ স্বরুপের চিন্তাকর এবং সর্বসাধারনকে তা শিক্ষা দাও। ঘোর মোহ নিদ্রায় অভিভূত জীবাত্মার নিদ্রাভঙ্গ কর। লক্ষ্য কর কিভাবে তিনি জেগে উঠছেন। আত্মা প্রবুদ্ধ হলে শক্তি আসবে, মহিমা আসবে, সাধুত্ব আসবে, পবিত্রতা আসবে-যা কিছু ভাল সবই আসবে।”

“Stand Up, Be Bold, Arise, Awake and Stop not till the goal is reached. All power is within you. You can do anything and everything.”
“সিস্টারস এন্ড ব্রাদারস্ অব আমেরিকা”-কয়েকটি শব্দ এক নবীন সম্বোধন; একটি ভাবপুঞ্জ, এক আলোড়নকারী শক্তি; এক অপূর্ব আহ্বান, এক বিস্ময়। নবীন সন্নাসী স্বামী বিবেকানন্দের দীপ্ত কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল এ শব্দগুচ্ছ ১৮৯৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ধর্মসভার উদ্বোধনী দিবসে। আনন্দ শিহরন অনুভব করেছিল শ্রোতারা। শ্রোতাদের কর্ন বিদারী করতালি আর হর্ষধ্বনিতে আলোড়িত ও মুখরিত হয়েছিল সভাস্থ বক্তার কন্ঠ নিঃসৃত শক্তিময় শব্দ গুচ্ছ ও শ্রোতৃমন্ডলীর আনন্দ হিল্লোল সভাগৃহ অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র বিশ্বে বিশ্ববাসীর হৃদয় স্পর্শ করল সেই অমৃত আহ্বান। এক নবজাগরন সূচিত হল বিশ্বে, বিশ্ববাসী দেখতে পেল এক নতুন সভ্যতার আলো। নতুন অধ্যায় রচিত হল ইতিহাসে।
মহাসভার প্রথমদিন স্বামীজীর বক্তৃতায় প্রারম্ভে হর্ষধ্বনি সম্পর্কে ধর্ম সভার কার্যকরী কমিটির সভাপতি ব্যারেজ লিখেছেন-“মি. বিবেকানন্দ যখন শ্রোতৃবৃন্দকে ভগিনী ও ভ্রাতৃগণ বলে সম্বোধন করলেন তখন এক তুমুল করতালি উত্থিত হয়ে কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়েছিল।” প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীযুক্তা এস কে ব্লজেট লিখেছেন-সেই যুবকটি উঠে যখন বললেন “আমার আমেরিকাবাসী ভাই ও বোনেরা”, তখন সাত হাজার নর-নারী এমন একটা কিছুর প্রতিশ্রদ্ধা নিবেদনার্থ উঠে দাড়াল তা ভাষায় প্রকাশ করতে সমর্থ ছিলনা। যখন বক্তৃতা শেষ হল তখন দেখলাম দলে দলে নারীরা তাঁর সান্নিধ্য লাভের জন্য বেঞ্চি ডিঙ্গিয়ে অগ্রসর হচ্ছে”। পরের দিন আমেরিকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হল বিবেকানন্দের বক্তৃতাই ধর্ম মহাসভার শ্রোতাদের হৃদয় জয় করেছিল। এ অত্যাশ্চর্য, অভূত পূর্ব ঘটনা জেনে বিশ্ববাসী আনন্দে ও অবাক বিশ্ময়ে অভিভূত হল। চিন্তাজগতে শুরু হল এক নব জাগরন। তিনি সেই মহাসম্মেলনে আনন্দ শিহরনের বর্ণনা তৎকালে উপস্থিত শ্রোতৃবর্গের মুখে অনেকবার শুনেছেন। তারা তাকে বললেন আমাদের স্বজাতীয় কোন ব্যক্তি এভাবে সম্বোধন করার কথা ভাবতে পারল না। সিস্টার নিবেদিতা বললেন-সেই মূহুর্ত থেকে বোধ হয় তাঁর নিশ্চিত সাফল্যের সূত্রপাত হয়ে ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণের বার্তাবাহক স্বামী বিবেকানন্দ চিকাগোর ধর্ম মহাসভায় বিশ্ববাসীকে সম্বোধন করে বললেন-
“বিবাদ নয়, সহায়তা;
বিনাশ নয় পরস্পরের ভাব গ্রহণ;
মত বিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।”

 

উপাধ্যক্ষ, উদয় শঙ্কর চক্রবর্তী
জেনারেল সেক্রেটারী, রামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রাম।

Share This:

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.