জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার পদক্ষেপ জরুরি

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যে পাঁচটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, সেগুলোর সবক’টিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে জলবায়ু সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম প্রস্তাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পৃথিবী ও নিজেদের রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন। দ্বিতীয় প্রস্তাবে তিনি বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখার এবং সমগ্র প্যারিস প্রবিধান বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দেন। তৃতীয় প্রস্তাবে তিনি দুর্বল দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত তহবিল সরবরাহ করার আহ্বান জানান।
চতুর্থ প্রস্তাবে দূষণকারী দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশমন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের এনডিসি (জাতীয় নির্ধারিত অবদান) বাড়ানোর পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। পঞ্চম প্রস্তাবনায় জলবায়ু শরণার্থীদের পুনর্বাসনকে একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের বিষয়ে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা একমত হলেও তা মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের জোরালো ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। দুর্ভাগ্যজনক, এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে অনেক আলোচনা হলেও তা যথাযথ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসছে না কেউ। এ সংক্রান্ত যাবতীয় উদ্যোগ কেবল প্রতিশ্রুতি আর কথামালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর ঝুঁকির দায়ভার বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলো এড়াতে পারে না। কারণ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোই দায়ী। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বেশকিছু অংশ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এমনটি ঘটলে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার জরুরি ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কী হবে- ইতঃপূর্বে এ বিষয়ে বেশকিছু উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর তাপমাত্রা ও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেভাবে বাড়ছে, তা মোকাবেলায় ব্যবস্থা না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, জনগণের জীবনযাত্রা ও অবকাঠামো খাতের ওপর। ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের ১৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর্থিক মূল্যে ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে জিডিপির ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০৫০ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকবে দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ। এটি বাস্তবিকই এক মহা দুশ্চিন্তার বিষয়। বস্তুত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রেই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে অধিক তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সেক্ষেত্রে বিপুল অর্থের পাশাপাশি সম্মিলিত বৈশ্বিক উদ্যোগও প্রয়োজন বলে মনে করি আমরা। ইতঃপূর্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের হার কমিয়ে আনার বিষয়ে যে মতৈক্য হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে বিশ্বের সব দেশকে এগিয়ে আসতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহায়তার জন্য অধিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর উচিত এসব ব্যাপারে সম্মিলিতভাবে জোরালো দাবি উত্থাপন করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো আমলে নিয়ে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে জাতিসংঘ, এটাই আমরা আশা করি।

Share This: