জগৎ জননী মা সারদা: উপাধ্যক্ষ, উদয় শঙ্কর চক্রবর্তী জেনারেল সেক্রেটারী, রামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রাম

মা সারদা দেবী সম্বন্ধে আমরা আলোচনা করি সাধারণত তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে-তিনি দেবী, তিনি মাতা, তিনি জ্ঞানময়ী জ্ঞান দাত্রী। শ্রীমা যে দেবী, শ্রীরামকৃষ্ণ তার পরিচয় দিয়ে গেছেন, শ্রীমা নিজ মুখেও বহুবার বলেছেন যে, শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে তিনি অভিন্ন। স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী সারদানন্দ প্রভৃতি ও এক বাক্যে বলে গেছেন যে, শ্রীমা শ্রীরামকৃষ্ণেরই শক্তি, তাঁর কার্য পরিপূরণের জন্য তাঁর বার্তা প্রচারের জন্য এসেছিলেন।

শ্রী শ্রী মায়ের সম্বন্ধে ব্যাপকভাবে আলোচনা আরম্ভ হয়েছে অল্পদিন, তাঁর সম্বন্ধে সাধারণভাবে প্রকাশ্য আলোচনা একেবারেই হত না। তাঁর ছবি বাজারে পাওয়া যেতনা নেহাৎ ঘনিষ্ঠ ভক্ত যারা তারাই কোন রকমে মায়ের ছবি সংগ্রহ করে তাদের নিজেদের কাছে পরম সম্পদ হিসেবে রেখেদিত ঠাকুর এবং স্বামীজীর ছবি বাইরে পাওয়া যেত। তাঁদের নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনাও হত। কিন্তু যুগাবতারের এই ভাব আন্দোলনে তাঁর সহধর্মিনীরও যে কোন ভূমিকা আছে এ সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলাম।
এর কারন প্রধানত দুটো। প্রথমত: অবতার পুরুষকে চিনতে সব সময়ই সাধারণ মানুষের একটু দেরিই হয়। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন: অজ্ঞান ব্যক্তিরা আমাকে মানবদেহ আশ্রিত বলে। মানবদেহ বিশিষ্ট বলে অবজ্ঞা করে। তারা আমাকে ভূতমহেশ্বর রুপে, সমগ্র জগতের নিয়ন্তা রূপে জানেনা-৯/১১।
ঠাকুরকেও আমরা জানতামনা। ঠাকুরের অন্য ঐশ্বর্য না থাকলেও আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের ছড়াছড়ি ছিল। তিনি মুহুমুহু: সমাধিস্থ হচ্ছেন-লোকে বলত: সাতবার মরে, সাতবার বাঁচে। আর তার ভিতর দিয়ে কথামৃত মন্দাকিনী বয়ে যাচ্ছে যা পান করে পন্ডিত মূর্খ সকলে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেই শ্রীরামকৃষ্ণকেও লোকে অবতার বলে চিনতে পারতনা। আর মা-যিনি বাইরের লোকের সঙ্গে কথা প্রায় বলতেনই না, যার মধ্যে কোন ঐশ্বর্য নেই। আড়ম্বর নেই বিদ্যার ঐশ্বর্য অর্থাৎ পরাবিদ্যার ঐশ্বর্য যেখানে লুপ্ত সেই মাকে লোকে কি করে চিনবে? মাকে চিনতে না পারার আর একটি কারন মা নিজেও নিজেকে লজ্জাপটাবৃতা করে লুকিয়ে রেখেছিলেন। দক্ষিনেশ্বরে বাস করতেন ঐ নহবতখানার ছোট্ট ঘরটিতে। তাঁকে বাইরের কেউ দেখতে পেত না। নহবতের পিঞ্জরে নিজেকে মা এমনভাবে লুকিয়ে রাখতেন যে দক্ষিনেশ্বর কালীবাড়ির খাজানী। যিনি সেখানে সর্বদা থাকতেন। তিনি একদিন মায়ের সম্বন্ধে বলেছিলেন: তিনি আছেন শুনেছি, কিন্তু কখনও দেখতে পাইনি। যিনি স্বয়ং মহামায়া। তিনি যদি ইচ্ছা করেন অন্তরালে থাকতে তাহলে জগতের কারও সাধ্য নেই তাঁকে দেখে। কারন জগৎ সম্পূর্ণভাবে তাঁর ইচ্ছাধীন। মা চাননি তাই মায়ের খবর তাঁর জগৎ জোড়া সংসারে ব্যাপক ভাবে প্রচারিত হতে সময় লেগেছিল।


ঠাকুর ছিলেন বিরাট এক শিল্পী। তিনি মাকে ধীরে ধীরে তার মনের মতো করে গড়ে তুলেছেন-যেমন জগন্মাতা স্বয়ং তাঁকে গড়ে তুলেছেন সহধর্মিনী যাতে তাঁর লোক কল্যাণ-লীলায়, অহৈতুকী-প্রেম-বিতরনের লীলায় যোগ্য সঙ্গিনী হয়ে উঠতে পারেন তারজন্য কোন প্রয়াসই ঠাকুর বাকি রাখেননি। অতি সাধারণ লৌকিক কাজ প্রদীপের সলতে কি করে পাকাতে হয়-তা থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতার উচ্চতম তত্ত্ব সমাধি রহস্য পর্যন্ত মাকে শিখিয়েছেন। কিন্তু এই অভূত পূর্ব শিল্পকর্মটি তিনি যখন রচনা করে চলেছেন তখন বাইরের কোলাহল। সংসারী মানুষের কটাক্ষ-এসব তিনি অবাঞ্চিত মনে করেছিলেন। তাই মায়ের বিকাশ ঘটেছে লোক চক্ষুর অন্তরালে। আজ ঠাকুরের এই শিল্প সৃষ্টিটি ঠাকুরেরই ইচ্ছায় সাধারণের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মানুষ মুগ্ধ হয়ে মাকে দেখছে। মাতৃলীলা আস্বাদন করছে-যার যেমন সমার্থ্য সেইরকম। যার যেমন সামর্থ্য-এই কারনে বলছি যে, মাকে সম্পূর্ণ ভাবে বুঝবার সামর্থ্য কারও নেই। স্বয়ং স্বামীজী তাঁর মহাপুরুষ গুরু ভাই স্বামী শিবানন্দকে একবার লিখেছিলেন: দাদা, রাগ করোনা, তোমরা এখনও কেউ মাকে বোঝনি। কাজেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যে তাদের সীমিত বুদ্ধি দিয়ে মায়ের অসীম মহিমা সম্পূর্ণ ভাবে শুধু বুঝবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সারদাদেবী সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন: ‘ও সারদা-স্বরস্বতী-জ্ঞান দিতে এসছে। রূপ থাকলে পাছে অশুদ্ধ মনে দেখে লোকের অকল্যান হয়। তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছে’। ও (সারদা) জ্ঞানদায়িনী, মহাবুদ্ধি মতী। তেলোভেলোর মাঠে এক দস্যুদম্পতি সারদাদেবীকে কালীরুপে দেখেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের ভ্রাতুস্পপুত্র শ্রীমায়ের স্বমুখেই শুনেছিলেন যে, শ্রী শ্রী মা স্বয়ং মা-কালী, জয়রামবাটীতে মায়ের বাড়িতে একটি বিড়াল ছিল। ব্রহ্মচারীগন তখন মায়ের সেবক। তিনি বিড়ালটিকে আদর যত্ন তো করতেনই না, বরং মাঝে মাঝে একটু-আধটু প্রহারাদিই করতেন। মাতা জানতেন, রাধু ও শ্রীশ্রীমায়ের ¯েœহে বিড়ালের বংশবৃদ্ধি হয়েছিল। একবার কলকাতা আসার সময় ব্রহ্মচারীকগণকে ডেকে মা বললেন: জান বেড়াল গুলোর জন্য চাল নেবে। যেন কারও বাড়ি না যায় গাল দেবে, বাবা। তারপর ভাবলেন শুধু এই টুকু বলাই বেড়ালের জগৎ ফিরবেনা। তাই আবার বললেন: দেখ জান বেড়ালগুলোকে মেরোনা। ওদের ভেতরেও তো আমি আছি “যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরুপেন সংস্থিতী” তিনিই যে আমাদের শ্রীশ্রীমা হয়ে এসেছেন নিজ মাতৃভাবকে অবলম্বন করে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। মা স্বমুখে বলেছেন: আমার শরৎ যেমন ছেলে, এই আমজাদ ও তেমন ছেলে। শরৎ স্বামী সারদানন্দ হলেন রামকৃষ্ণ মিশনের কর্ণধার, সম্পাদক, আর আমজাদ একজন ডাকাত। মা বলেছেন-“আমি সতের ও মা, অসতের ও মা”।


শ্রীমায়ের জীবনের রহস্যটি শ্রীরামকৃষ্ণ অবগত ছিলেন শ্রীমাকে তাঁর স্বরূপ স্বরণ করিয়ে দিয়ে এবং নিজের অসমাপ্ত কাজের ভার তার উপর অর্পন করে শ্রীরামকৃষ্ণ নিশ্চিত হয়েছিলেন। তাই বোধহয় শ্রীমায়ের দক্ষিনেশ্বরে আগমনের প্রথম পর্বেই তার লীলাসম্পূরণ কর্ত্রীকে নিজ অন্তরের পূজা নিবেদন করে জগতের কাছে প্রতিষ্ঠাতা করার প্রয়োজন অনুভুবু কওে ছিলেন। ষোড়শী পূজার মধ্যে সেই প্রয়োজনই চরিতার্থতা লাভ করেছিল এর মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীমাকে প্রথম প্রতিষ্ঠিত করে ছিলেন বিশ্ব মাতৃত্বের বেদীতে। শুধু প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনই নয় স্বামীজীর ভাষায়-যার আবির্ভাবে সমগ্র ভারতে এক নতুন যুগের সুচনা হয়েছে। সেই শক্তির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও আবশ্যক ছিল। তাই ষোড়শী পূজার সময় শ্রীমাকে দেবীর আসনে বসিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন: ‘হে বালে, হে সর্ব শক্তির অবীশ্বরী মাত: ত্রিপুরা সুন্দরী, সিদ্ধিকার উন্মুক্ত কর, ইহার (শ্রীমা), শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূত হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর এবং পূজাশেষে দেবীর কাছে নিজেকে নিবেদন করে নিজের সমস্ত সাধনার ফল, জপের মালা প্রভৃতি সর্বস্ব তাঁর চরণে চিরকালের জন্য সমর্পণ করেছিলেন। কোন দৃষ্টিতে শ্রীরামকৃষ্ণ সারদা দেবীকে দেখতেন ষোড়শী পূজাই সে সম্পর্কে শেষ কথা। জগতের সাধন ইতিহাসে, এটি একক ও অনন্য দৃষ্টান্ত। একমাত্র ঠাকুরই মাকে ঠিকঠিক জেনেছিলেন। বর্তমান মানব সমাজে পারিবারিক জীবনে ভীষণ অশান্তি জীবনকে দু:সহ করে তুলেছে। পারিবারিক জীবনে সুখ শান্তি বিশেষভাবে নির্ভর করে মাতৃজাতির উপর: বর্তমান জগতের মাতৃজাতিকে সেবার আদর্শ শিক্ষা দেবার জন্য গার্হস্থ্য সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে শ্রীশ্রী মাতা ঠাকুরানীর আদর্শ জীবনের অভিব্যক্তি। ভারতে তথা বিদেশে তাঁর মহতী জীবনের প্রভাব সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পবিত্রতম মধুরতম সুন্দরতম শব্দ ‘মা’। অভয়প্রদ, আশাপ্রদ, শান্তিপ্রদ রূপ মাতৃমূর্তি। বর্তমান পৃথিবীর অশান্ত মানব হৃদয়ে শান্তিবারি সিন্টন করতে জগৎ করুনা মাতৃরূপে আবির্ভূত্য। দেখাও যাচ্ছে জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভেদ-বিসম্বাদ ভুলে পৃথিবীর সকল দেশের নরনারী মাতৃদর্শনে ছুটে আসছে। মাতৃচরণে লুটিয়ে পড়ছে ‘মা’ ‘মা’ শব্দে। আকাশ বাতাস প্রতিধ্বনিত করে তুলেছে। আর জগজ্জননী মায়ের সেই কথাগুলি আমাদের কানে অনুরনিত হচ্ছে: “ওরাও আমার ছেলে”। আমি সতের ও মা, অসতের ও মা”। আমার শরৎ যেমন ছেলে, এই আমজাদও তেমন ছেলে। মায়ের করতল ছিল রক্তাঙ। অনেকেই তা দেখার সুযোগ পেয়েছেন। পদতলও ছিল লাল ঠিক স্থল পদ্মের আভা, মাথায় ছিল সুদীর্ঘ ঘন
কালো একরাশ চুল। সুক্ষ্ম রেশন সুতোর মতো উজ্জল মসৃণ সামনের দিকটা অল্প কোকড়ানো। সুগঠিত মুখে দীর্ঘ নাসা-অপূর্ব সুন্দর। দৃষ্টি প্রশান্ত, স্থিও, কৃপামাখানো-যা সকলের অন্তরে সর্বদা করুনা-বর্ষণ করত। প্রশস্ত উজ্জল কপাল, প্রসন্নমুখ দেখলেই চিত্ত শান্ত হয়। শ্যাম গৌর রং প্রথমে ছিল উজ্জল, শেষ বয়সে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। চেহারা ছিল লম্বা। হাত-পাও অপেক্ষাকৃত লম্বা। একটু বাদিকে কাৎ হয়ে চলতেন ধীরে ধীরে। -মাকে চেনা বড় শক্ত ঘোমটা দিয়ে যেন সাধারণ মেয়েদের মত থাকেন। অথচ মা সাক্ষাৎ জগোদস্বা। ঠাকুর না চিনিয়ে দিলে আমরাই কি মাকে চিনতে পারতাম। শ্রীশ্রী মা ছিলেন অবগুন্ঠনবতী “অনন্ত রাধার মায়া কহনে না যায়”-শ্রীশ্রী মায়ের সরূপ ইঙ্গিত করতে গিয়ে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণই একথা বলেছেন।
নিবেদিতার কাছে সারদাদেবী ক্রমে মেরী মাতা হয়ে উঠেছিলেন। পাশ্চাত্যের সমগ্র ধর্মীয় সংস্কৃতি যে মাতৃরুপের সামনে অবনত। খ্রীষ্টায় সংস্কারে যিনি সর্বোচ্চ মাতৃত্বের প্রতীক। সেই মানব পুত্রের কুমারী জননীর সঙ্গে নিবেদিতা সারদা মাতার সাদৃশ্য দর্শন করেছেন। এতে শ্রীমায়ের অপার্থিব চরিত্র মহিমার কিছু আভাস মেলে। মেরী ও সারদা উভয়ের মধ্যেই নিবেদিতা। অপ্রতিরোধী সহন দেখে ছিলেন। আরও গভীর সত্তায় উভয়ের ঐক্য দেখেছেন-তার সর্বোত্তম রুপ প্রকাশিত হয়েছে সারদা দেবীকে লেখা ১১ই ডিসেম্বর ১৯১০ চিঠিতে। সারা বুলের জন্য বস্টনের এক গির্জায় প্রার্থনা করার সময়ে নিবেদিতার মনে মেরী মাতার স্থানে ভেসে উঠেছিল সারদা মাতার রুপচ্ছবি। তিনি গির্জা থেকে ফিরে তাঁর ডায়েরীতে লেখেন: গির্জায় গিয়াছিলাম সারদাদেবীকে আমার মেরীমাতা বলিয়া মনে হইল। নিবেদিতা চেয়েছিলেন, সরদাদেবী ও বিবেকানন্দের আশীর্বাদে যেন সেই অন্ধকার কেটে যায় এর জন্য নিবেদিতাকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয় এবং সেই কঠোর সংগ্রামে বহুল শক্তিক্ষয় করে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। নিবেদিতা দেখেছিলেন মাতাদেবী সহ¯্রকাজে লিপ্ত থেকেও কী নির্লিপ্ত। যখন মনে হচ্ছে তিনি বস্তুমগ্ন, তখন যথার্থতা তিনি আত্মমগ্ন। তার একেবারে ফটোচিত্রই রয়েছে নিবেদিতার সঙ্গে মায়ের ফটোটি দেখলেই তা বোঝা যায়। তাতে দেখি মা নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে আছেন, কী গভীর ¯েœহ তাঁর নয়নে।
১৮৫৩-২২ ডিসেম্বর (৮ পৌষ ১২৬০, কৃষ্ণা সপ্তমী) বৃহস্পতিবার রাত্রি দুই দন্ড নয়পল সময়ে জয়রামবাটীতে জন্ম, রামচটন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্যামা সুন্দরী দেবীর প্রথম কন্যা। জন্মের পূর্বে রামচন্দ্রের স্বপ্নদর্শন: একটি হেমাঙ্গী বালিকা তাহার পৃষ্ঠোপরি পড়িয়া কোমল বাহুপাশে তাহার কন্ঠ বেষ্টন করিয়াছে। রামচন্দ্র প্রশ্ন করেন-‘কেগো তুমি’; বারিকার উত্তর: এই আমি তোমার কাছে এলুম। যারা পূর্ব পূর্ব অবতারদের লীলা সঙ্গিনী রূপে এসেছিলেন, যদি ঐতিহাসিক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করি তাহলে অধ্যাত্মিক অভ্যুত্থানের জন্যে তাদের অবদানের স্বল্পতা দেখে বিস্মিত হই। কিন্তু শ্রীশ্রী মা যে ভাবে ঠাকুরের ভারধারাকে চারিদিকে প্রসারিত করতে সমর্থ হয়েছেন তা দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। ঠাকুর নিজেও মাকে শরীর ত্যাগের আগে বলেছিলেন: “এ (শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে) আর কি করেছে তোমাকে এর অনেক বেশি করতে হবে”। সেই অনেক বেশি কাজ শ্রীমা করেছেন তাঁর মৃতু ¯েœহের মাধ্যমে। ঠাকুরের সন্তানরা মাকে ঠাকুর থেকে পৃথকরুপে দেখতেন না। ঠাকুরেরই মাতৃরুপে আর একটি অভিব্যক্তি দেখতেন। শ্রীশ্রীমা নিজেও বলেছেন: “ঠাকুরের জগতের প্রত্যেকের উপর মাতৃভাব ছিল। সেই মাতৃভাব জগতে বিকাশের জন্যে আমাকে এবার রেখে গেছেন।”
বসুত মায়ের মাতৃভাব শ্রীরামকৃষ্ণের ভাব প্রচারেরই একটা মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে। বলা যেতে পারে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সন্তান মায়ের মাহাত্ম্য বোঝেনা। কিন্তু তা বলে মাকে কম আস্বাদন করেনা অবোধ শিশু তার নির্বোধ মন দিয়ে আস্বাদন করে। তার অন্তর দিয়ে প্রাণ দিয়ে আস্বাদন করে। মাকে সে বোঝাতে পারেনা, ভাষা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারেনা, তার মাধুর্য অপরের কাছে প্রকাশ করতে পাওে না। কিন্তু নিজে পরি পূর্ণরুপে আস্বাদন করে। তার ঐ ছোট্ট হৃদয়টি সেই আস্বাদনে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। আর মা সেই অবসরে-যদি তিনি চান-অতি সহজে সন্তানকে তার যা শেখানোর শিখিয়ে দিতে পারেন। শ্রীশ্রী মা জগজ্জননীরুপে এই অতি মধুর কার্যকর পথটি অবলম্বন করেছিলেন। তার গুরুভার মাতৃত্বের আবরনে মন্ডিত। তিনি প্রথমে ¯েœহ দিয়ে ভালবাসা দিয়ে সন্তানের হৃদয়টি জয় করেনিতেন। তারপর অতি সহজে তার মধ্যে ঠাকুরের ভাবসম্পদ ঢেলেদিতেন। আজও আমরা যখন মায়ের জীবনী পড়ি। তার কথা ভাবি তখন তাঁর মাতৃরুপটাই প্রথমে আমাদের অভিভূত করে। এর পরে আমরা যখন তাঁর উপদেশের দিকে তাকাই তখন প্রায় বিনা প্রতিরোধে সেগুলি মেনে নিই। কারন ইতিপূর্বেই মা তাঁর ¯েœহ দিয়ে আমাদের মন জয় করে ফেলেছেন আমরাও মাকে ভালবাসতে শুরু করেছি। আর যাকে ভালবাসা যায় তাঁর কথা মেনে নিতে আমরা সাধারণত দ্বিধা করিনা। এই মাতৃভাভ যতই আলোচনা করা যাবে, ততই আমরা উপলব্ধি করতে পারব। যুগাবতারের জগৎ-উদ্ধার কার্যে তার লীলা সঙ্গিনীর ভূমিকা কতখানি। মায়ে মাতৃত্বের বৈশিষ্ট্য এই যে, তা কোন গন্ডির ভিতরে সীমিত নয়। মা তার ¯েœহ দিয়েই শ্রীরামকৃষ্ণলীলাকে পুষ্ট করেছেন। ঠাকুরের অন্তধ্যনের পর আমরা দেখেছি মা অকৃপনভাবে আধ্যাত্মিক সম্পদ বিতরণ করে যাচ্ছেন। কিন্তু মায়ের মধ্যেকার এই গুরুশক্তির উদ্বোধনও ঠাকুরই করেছিলেন। এই ভাবে নিজের অন্তরঙ্গ ত্যাগী সন্তানদের উপলক্ষ করে ঠাকুর নিজের জগৎ উদ্ধার লীলার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মাকে টেনে নিয়ে এলেন। পরবর্তীকালে মা অধিকারী-অনধিকারী নির্বিশেষে অকৃপনভাবে মানুষকে মন্ত্র দিয়েছেন। কিন্তু নিজেকে তিনি কখনও গুরু মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন: তাঁর মধ্য দিয়ে ঠাকুরের গুরু শক্তিই কাজ করে চলছে। শ্রীরামকৃস্ণ অবত্যরের একটি বিশেষ অবদান হল নারীর মর্যাদাকে পুন: প্রতিষ্ঠা করা। স্বামীজী বলেছেন: সেই জন্যই রামকৃষ্ণাবতারে “স্ত্রী গুরু-গ্রহণ সেই জন্যই নারীভাব সাধন। সেই জন্যই মাতৃ ভাব প্রচার”। নিবেদিতা বলেছেন: শ্রীশ্রী মা হলেন নারীত্বের আদর্শ সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ কথা, শ্রীশ্রীমা ঠাকুরের এই বানী প্রচার করেছেন উপদেশের মাধ্যমে নয়, আচারনের মাধ্যমে। কারন মা ঠাকুরেরই অপর রূপ ঠাকুর কল্পতরু হয়েছিলেন মাত্র একদিন, কিন্তু মা প্রতিদিন কল্পতরু ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও চিরকাল। আমি সত্যিকারের মা, গুরুপত্ম মা নয়। পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়-সত্য জননী।
যদি শান্তি চাও
কারও দোষ দেখোনা।
দোষ দেখবে নিজের।
জগৎকে আপনার করে নিতে শেখো।
কেউ পর নয়
জগৎ তোমর-সারদা দেবী।
মায়ের কাছে কেউ ত্যাজ্য ছিলনা। তার ¯েœহের প্রবাহ কোনভাবে কোথাও কুন্ঠিত হচ্ছেনা। স্থান-কাল-পাত্র বিচার করে এই ¯েœহ বর্ষিত হচ্ছেনা। সর্বত্র সমভাবে এই মাতৃ ¯েœহ প্রসারিত। এইটি এক অদ্ভুত ব্যাপার। মায়ের চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্য বিষয়ে আমরা তার জীবনে অনেকগুলি ঘটনা দেখতে পাই।

মায়ের কৃপাপ্রাপ্ত একটি যুবক-ভক্তের পাদস্থলন হয়েছে। অথচ মায়ের কাছে সে আগের মতোই যাতায়াত করে। অন্য ভক্তেরা মা বললেন, তিনি যেন ঐ যুবকটিকে তাঁর কাছে আসতে নিষেধ করেদেন। মা ঐ যুবকটির জন্য খুব দু:খ প্রকাশ করলেন, কিন্তু ভক্তদের বললেন: আমি নিষেধ করতে পারিনা, মা হয়ে ছেলেকে “এসোনা” বলা আমার মুখ দিয়ে বেরুবে না। মা বলতেন: ভাঙতে সব্বাই পারে, গড়তে পারে কজনে? নিন্দা ঠাট্টা করতে পারে সব্বাই, কিন্তু তাকে ভাল করতে পারে কজনে? বলতেন: আমার ছেলে যদি ধুলোকাদা মাখে, আমাকেই তো ধুলো ঝেড়ে কোলে নিতে হবে”।
যখন দক্ষিনেশ্বরে ঠাকুরের পার্ষদের ধীরে ধীরে তার পদপ্রান্তে সমাগত হচ্ছেন সেই সময়কার কথা। ঠাকুর একদিন মাকে বলছেন: তুমি বাবুরামকে অতকরে খেতে দাও। তার ফলে সে রাত্রে ঘুমুবে। তাহলে ভজন করবে, সাধন করবে কি করে? মা বললেন: ও দুখানি রুটি বেশী খেয়েছে বলে তুমি অত ভাবছ কেন ? তাদের ভবিষ্যৎ আমি দেখব। তুমি ওদের খাওয়া নিয়ে কোন গালাগালি করোনা। ঠাকুরের সব কথা মা নির্বিবাদে মেনে নিতেন। তাই ঠাকুরের আদেশকে অগ্রাহ্য করতেও তিনি দ্বিধা করলেন না। ঠাকুর কিন্তু তাতে বিরক্ত হননি বরং আনন্দিত হয়েছেন। কারন এইটাই তিনি চাইছেন-মাকে তার মাতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দেখতে।

সহায়ক গ্রন্থ
শতরূপে সারদা
সম্পাদক স্বামী লোকেশ্বরানন্দ
রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার।

Share This:

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.