কুড়িগ্রামের সেই ইউএনও কাজী আবেদ হোসেন সোনার বাংলার গোল্ডেন ম্যান

image3পাছের কথা আগেই বলে নেয়া ভাল- কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সেই বহুল আলোচিত ইউএনও কাজী আবেদ হোসেনকে নিয়ে আজকের এই লেখাটিকে তথ্যভারক্রান্ত করবো না। তার সফল কার্যক্রমগুলো আমার অনুভূতির ফিল্টারে ফেলে ছাকনী দিবো মাত্র। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার মানুষের প্রাণের ভালবাসা অর্জনকারী ইউএনও কাজী আবেদ হোসেন এখন আর ইউএনও নন, তিনি মস্তবড় অফিসার হয়েছেন। প্রবাস কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এতো উচুঁ স্থানে গিয়েও তিনি কুড়িগ্রামকে ভুলতে পারেন নি। এখনো তিনি কুড়িগ্রামের ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের কথা ভাবেন। অতি সম্প্রতি তিনি কুড়িগ্রাম এসেছিলেন। মিলিত হয়েছিলেন ভালবাসার মানুষগুলোর সাথে। এখানকার মানুষের ভালবাসা পেয়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন।
কাজী আবেদ হোসেন আমাদের এই মাটিরই সন্তান। তিনি  রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার সানেরহাট ইউনিয়নের খোলাহাটি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। রংপুর ক্যাডেট কলেজের একজন মেধাবী ছাত্র হয়েও সেনাবাহিনীতে যোগ না দেয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে। তিনি অকপটে বলে দিলেন- ‘‘আমিনুর সাহেব আমার নেশা হচ্ছে- মানুষকে ভালবাসা। আমি ভালবাসা দিয়ে সব কিছু জয় করতে চাই। এদেশের দুঃখী-দরিদ্র মানুষগুলোর সাথে থেকে তাদের দুঃখের ভার কাঁধে নিতে চাই এবং সেই দুঃখ ভারের ওজন কমাতে চাই। সম্পুর্ণরূপে না পারলেও দুঃখী-দরিদ্র মানুষগুলোর দুঃখের ভার কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছি। সিভিল প্রশাসনে না আসলে হয়তো এই কাজগুলি করতে পারতাম না।’’ তার দেশ প্রেম মেশানো আবেগঘন কথাগুলি সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে।
কাজী আবেদ হোসেন একজন উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা হলেও তার ভিতরে আমি সাহিত্যের সম্ভার দেখতে পেয়েছি। তিনি ছন্দ দিয়ে বহু কিছু লিখতে পারেন। যেকোন স্থাপনার সুন্দর নাম দিতে পারেন। পার্বত্য জেলা বান্দরবনে তিনি যখন এনডিসি ছিলেন তখন তৎকালীন জেলা প্রশাসককে সাথে নিয়ে তিনি পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে পথ হারিয়ে আবিস্কার করেছিলেন সবুজে ঘেরা নয়নাভিরাম একটি ভ্যানু। পাহাড়ের পাদদেশে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ গাছ-গাছালির সাথে যেন নীল আকাশ এসে মিশে গেছে। তিনি এমন একটি সুন্দর স্থানের নামকরণ করেছিলেন ‘নীলাচল’’। বর্তমানে এই স্থানটি ‘‘নীলাচল পর্যটন’’ কেন্দ্র নামে পরিচিত। তিনি উদ্যোগ নিয়ে সেই নীলাচলকে পর্যটনের রূপ দিয়ে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের তৃষ্ণা মিটিয়েছেন।
নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় তিনি ইউএনও পদে যোগদান করার পর তার সাফল্যের গল্পটি তাকে খ্যাতির চুঁড়ায় নিয়ে যায়। ওই উপজেলাটি ছিল হাওর অঞ্চল। ওখানকার মানুষ পহেলা বৈশাখে হাটু জলের ভিতর পোনা মাছ এবং মা মাছ শিকার করার মধ্যদিয়ে বিশ্বাস করতো আজ মাছ পেলে সারা বছর মাছ পাওয়া যাবে। এমন ক্ষতিকর কুসস্কারের বিষয়টি তিনি স্বচোখে দেখার পর উদ্যোগী হয়ে সেখানকার মানুষদের সাথে আলোচনা করে তাদের ভ্রান্ত ধারণা দুর করেন। এরপর থেকে ওই অঞ্চলে পহেলা বৈশাখ থেকে ৩০ আষাঢ় পর্যন্ত সময়টিতে মানুষজন মা মাছ এবং পোনা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন। যার সুফল পেয়েছিলেন সেখানকার ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষগুলো। যে চার লাখ মানুষ কুসঙ্কার পালন করতে গিয়ে দৈনিক ২শ’ টাকা রোজগার করতো, সেই মানুষগুলি কুসস্কার মুক্ত হয়ে দৈনিক ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা রোজগার করতে শুরু করেন। এ কারণে মোহনগঞ্জ উপজেলাবাসী তাকে আজো ভূলতে পারেনি। এই মৎস্য বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে তিনি জীবনের ঝুুঁকিও নিয়েছিলেন। মাছ ধরা বন্ধকালীন সময় তিনি রাতের আধারে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে হাওর অঞ্চলের গভীরে চলে যেতেন। দেখতেন কেউ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার করছে কি না। তার নেতৃত্বাধীন মৎস্য বিপ্লবের কথা পৌছে যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানে। ২০০৯ সালে রাজধানী ঢাকার ওসমানী মিলনায়তনে আয়োজিত জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মা মাছ এবং পোনা শিকার বন্ধ রেখে দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন। তার দেখানো পথ অনুসরণ করে সরকার দেশী মাছ রক্ষায় মা মাছ শিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যবস্থা চালু করেন।
কাজী আবেদ হোসেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর তার নজরে চলে আসে এখানকার নদ-নদী ও বিল-ঝিলের বিষয়টি। মোহনগঞ্জের মতো একই কর্মসূচি তিনি কুড়িগ্রামেও চালু করে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেন। মা মাছ যখন ডিম ছাড়ে সেই সময় তিনি মাছ ধরা বন্ধ করে দেন। আর তার এই মহতি কাজে সহায়তা দেন ন্যাশনাল সার্ভিসের হাজার হাজার যুবক-যুবতি। মা মাছ এবং পোনা মাছ শিকার নিষিদ্ধকালীন সময়ে প্রান্তিক জেলেরা যখন খাদ্য কষ্টে ভুগতে শুরু করলেন তখন তিনি তাদের জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তার এই উৎকৃষ্ট কার্যক্রম দেখার জন্য আমি সরেজমিনে ধরলা নদীতে গিয়ে দেখেছিলাম- যে নদীতে প্রকাশ্যে মাছ দেখা যেতনা, সেই নদীতে মাছের খেলা দেখতে পেয়ে মন ভরে গিয়েছিল। তার মাধ্যমে কুড়িগ্রামেও ঘটেছিল আরেক দফা মৎস্য বিপ্লব।
কাজী আবেদ হোসেন ন্যাশনাল সার্ভিসের দু’ বছর মেয়াদী চাকুরীজীবিদের ভাগ্যান্নয়নের লক্ষ্যে উদ্যোগী হয়ে সফলতার নাগাল পেয়েছিলেন। ন্যাশনাল সার্ভিসের কর্মীরা চাকুরী শেষে কি করবেন এমন চিন্তা মাথায় নিয়ে তিনি ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করে কুড়িগ্রাম উপজেলা চত্বরে গড়ে তুললেন ‘‘মধুরিমা’’ নামের একটি জেনারেল ষ্টোর। এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছিলেন ন্যাশনাল সার্ভিসের কর্মীরা। এ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি বহুমাত্রিক ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হয়। ন্যাশনাল সার্ভিসের কর্মীরা মধুরিমায় পন্য সরবরাহ করে লাভ করতেন। আবার মধুরিমা থেকে বিক্রিত পন্যের লভ্যাংশের ভাগও পেতেন। এছাড়াও  মধুরিমায় নায্যমুল্যে পন্য বিক্রির কারণে কুড়িগ্রামের বাজারদরের পাগলা ঘোড়াও ছিল পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আর এতোসব কিছু হয়েছে সেই ইউএনও কাজী আবেদ হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে।
তৎকালীন ইউএনও কাজী আবেদ হোসেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলাবাসীর কাছে  সুপার হিরো খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তার নাম মানুষের মুখে মুখে ফিরছিলো। ব্যাপক কৌতহুল নিয়ে তার সাথে আমি যখন প্রথম পরিচয় হই, তখন তার হালকা-পাতলা গড়নের মিষ্টি চেহারা দেখে বিশ্বাস-ই করতে পারছিলাম না যে, ইনি এতো সব ইতিবাচক কর্মকান্ড করছেন। বিনয়ী স্বভাবের কাজী আবেদ হোসেনের সাথে কথা বলে এবং তার নেয়া গৃহীত কর্মকান্ডগুলি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়ে আমি তাকে নিয়ে একটি বিশ্লেষনধর্মী লেখা এই পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলাম। যার শিরোনাম ছিল ‘‘কুড়িগ্রামের ইউএনও কাজী আবেদ হোসেন ডিজিটাল যুগের রবিনহুড’’। সেই লেখাটি ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তিনি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মাত্র দু’ বছর ইউএনও পদে দায়িত্ব পালন করে সারাজীবনের জন্য এখানকার মানুষের মনে ঠাঁই করে নিয়েছেন। তার সম্পর্কে আমি যদ্দুর জানি তা এই স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়।
তাকে ঘিরে এই লেখার উপসংহারে এতোটুকু বলবো- কুপি বাতির শলতে যেমন নিজেকে পুড়িয়ে অন্ধকারকে আলোকিত করে, ঠিক তেমনি কাজী আবেদ হোসেন সেই কুপি বাতির শলতের মতো নিজেকে পুড়িয়ে এই সমাজ এবং এই দেশকে আলোকিত করতে পেরেছেন। কুপি বাতিতে যেমন জ্বালানী তেল লাগে, তেমনি তার জ্বালানী হচ্ছে অদম্য কর্মস্পৃহা। আইন এবং তার স্বীয় বিবেকের সংমিশ্রণে তিনি প্রশাসন চালাতেন বলেই এতোখানি সাফল্য পেয়েছিলেন।  এর আগের লেখায় তাকে বলেছিলাম ডিজিটাল যুগের রবিনহুড। আর এবার সেই ইউএনও কাজী আবেদ হোসেন স্যারকে বলবো- তিনি-ই হচ্ছেন- আমাদের সোনার বাংলার গোল্ডেন ম্যান।

Share This: