কুমারী রূপে দেবী ভগবতী শক্তির বেশি প্রকাশ

উপাধ্যক্ষ উদয় শঙ্কর চক্রবর্তী, জেনারেল সেক্রেটারী শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রাম: 

ওঁনমানি কুলকামিনীং পরমভাগ্য
সন্দায়িনীং কুমারবর চাতুরীং
সকল সিদ্ধিদানন্দিনাম।
প্রবাল গুটিকাস্রজাং রজতরাগ বস্ত্রান্বিতাং
হিরন্যাতুলভূষনাং ভূবনবাক্
কুমারীং ভজে (প্রনাম মন্ত্র)

সনাতন হিন্দুধর্মের আকর বেদ, পুরানতন্ত্র ও ভিন্ন ভিন্ন দার্শ নিক শাস্ত্রগ্রন্থ সমূহে যত প্রকার সাধনা, অনুভব ও অভিজতা আছে, হিন্দুধর্ম তার যুগ যুগান্তর ব্যাপী তত্ত্বান্বেষনের সুমহান ইতিহাসে যতদের দেবীর সাধনার প্রবর্তন করেছে শ্রী শ্রী দূর্গা পূজায় তার পূর্ণ সমন্বয় ঘটেছে। এই সম্বন্বিত দূর্গাপূজার অঙ্গপূজারূপে কুমারী পূজা আমাদের কাছে এক গভীর তত্ত্বের দ্বারোহ্মাটন করেছে। শ্রী শ্রী দূর্গাপূজা, শ্রী শ্রী কালীপূজা, শ্রী শ্রী জগদ্ধাত্রীপূজা, শ্রী শ্রী অন্নপুর্নাপূজা এবং কামাখ্যাদি শক্তক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন আছে। কুমারী পূজার মাহাত্ম্য যোগিনীতন্ত্রে পাওয়া যায়- একটি মাত্র কুমারী পূজা করলে মহৎফল লাভ হয়ে থাকে। কুমারী পুজনের ফল আমি বর্ননা করতে সমর্থ নই। হে অম্বিকে! কুমারীগনও শক্তিগন এই অখিল চরাচর স্বরূপ। যদি একটি যুবতীর অর্চনা করা যায় তাহলে তার দ্বারাই সমস্ত দেবীগন পূজিতা হয়ে থাকেন সন্দেহ নেই।
‘যোগিনী তন্ত্রে’ কুমারী পূজার আখ্যায়িকাটিতে বলা হয়েছে ব্রহ্মশাপ বশে মহাতেজা বিষ্ণুর দেহে পাপ সন্ধার হয়েছিল। সর্বজ্ঞ বিষ্ণু সেই পাপে প্রপীড়িত হয়ে হিমাচল সন্নিধানে গমন পূর্বক তপস্যাচরনে প্রবৃত্ত হলেন এবং সেই পাপের ক্ষয়কারী মহাকালী অষ্টাক্ষরী মহাবিদ্যার দশ সহ¯্র বৎসর পর্যন্ত জপ করেছিলেন। ফলে বিষ্ণুর তপস্যায় মহাকালী সন্তুষ্টা হন, দেবীর সন্তোষ মাত্রই বিষ্ণুর হৃদপদ্ম হতে সহসা ‘কোলা’ নামক মহাসুরের আবির্ভার হয়, অনতিকাল মধ্যে সেই কোলাসুর ইন্দ্রাদি দেবগনকে পরাজিত করে অখিল ভূমন্ডল, বিষ্ণুর বৈকুন্ঠ, ব্রহ্মার কমলাসন প্রভৃতি সকলই হরন করে। তখন পরাজিত বিষ্ণু প্রভৃতি দেবগন ‘হে বৎস বিষ্ণে! আমি অধুনা কুমরী রূপ ধারন করে কোলানগরী গম পূর্বক অসুর কুলবর্বর কোলাসুরকে সবান্ধবে নিহত করব রক্ষ রক্ষ’ বাক্যে ভক্তি বিন¤্রচিত্তে দেবীর স্তব করতে প্রবৃত্ত হন। দেবগনের স্তবে সন্তুষ্টা দেবী বললেন।


একথা বলেই করাল বদনী মহাকালী বিপ্রকুমারীর রুপ ধারণ করে কোলাপুরে গমন করে কোলাসুরের নিকট কিছু খাদ্য প্রার্থনা করেণ – ২ মহারাজ আমি জনক জননা বিহীনা ও নিঃ সাহায়া আমাকে কিন্ধিৎ খাদ্যদ্রব্য প্রদান করুণ দেবীর এই কথায় মুগ্ধ হয়ে কোলাসুর সেই দেবীকে নিজ অন্তঃপুরে নিয়ে যায় এবং মনিরঞ্জিত আসনে উপবেশন করিয়ে নানা রকম ভোজ্য দ্রব্য প্রদান করে। বালিকা সে-সমস্তই অল্প সময়ের মধ্যেই খেয়ে ফেলে বলেন “এতে আমার তৃপ্তি হলো না” দেবীর এই বাক্য শ্রবনে কোলাসুর বলেন- “যথা তৃপ্তির্ভবেদ্বাল তাবচ্চ তত্তবাকুরু”। “হে বালে! যাতে তোমার তৃপ্তি হয় তাই কর”। বালারূপিনী কালী কোলাসুরের এই বাক্য শ্রবনে তার কোষ, অশ্ব, হস্তী, রথ, সৈন্য, বান্ধব, প্রভৃতি সমস্তই ভক্ষন করে অবশেষে মহাবল কোলাসুরকেও ভক্ষন করে ফেলেন। দেবীর এই অদ্ভুত কার্য দর্শনে-দেব গন্ধর্ব, কিন্নর-দেবপত্নীগন সকলে সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে সেই কুমারীর অর্চনা করছেন। অনন্তর ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহে শ্বরাদি সকলে এবং তৎপরে ব্রহ্মান্ডতল নিবাসী সর্বলোকই নিজ নিজ গৃহে কুমারী পূজায় প্রবৃত্ত হলেন।
সাধারনতঃ যে মেয়ে রজঃসলা হয়নি, অবিবাহিত ব্রাহ্মন কন্যাকেই কুমারীরূপে পূজা করা হয়। অন্যজাতির কন্যাকেও কুমারীরূপে পূজা করতে বাধ নেই, কুমারী মাত্রই সর্ববিদ্যাস্বরূপা। কুমারী পূজার বিধি সম্পর্কে তন্ত্রে বলা হয়েছে-দেবাদিদেব মহাদেব মহাদেবীকে লক্ষ্য করে বলেছেন। হে সুন্দরী! শত কোটি মুখে, সহ¯্রকোটি জিহ্বায় কুমারী পূজার ফল ব্যক্ত করতে পারবো না।

হে শিবে! কুমারী পূজায় জাতিভেদনেই! সর্বজাতীয় কুমারীগনেরই পূজা করা যায়। কুমারী পূজায় জাতি বিচার করলে নরকে পতিত হতে হয়, তার আর পুনরুদ্ধার হয় না। মন্ত্রবান ব্যক্তি অবিচারিত কর্ম করলে পাপ ভাগী হয়ে থাকে। কুমারী কথার সাধারন অর্থ কন্যা। তন্ত্রশাস্ত্র মতে অজাতপুষ্পা ষোড়শ বর্ষবয়ঃক্রম পর্যন্ত অবিবাহিত কন্যাকেই কুমারীরূপে পূজা করা চলে। বয়ঃক্রসানুসারে পূজাকালে কুমরীর পৃথক পৃথক নামকরণ করা হয়।
এক বৎসরের কন্যা সন্ধ্যা দুই সরস্বতী তিন ত্রিধামূর্তি, চার কালিমা; পাঁচ সুভগা; ছয়-উসা; সাত-মালিনী; আট-কুন্ধিকা; নয়- কালসন্দভা; দশ-অপরাজিতা; এগার-রুদ্রানী; বার-ভৈরবী; তের-মহালক্ষী; চৌদ্দ- পীটনায়িকা; পনের-ক্ষেত্রজ্ঞ; ষোল- অন্নদা; নবমবর্ষকে কেহ কেহ কাল সন্দর্ভা এবং ষোড়শ বর্ষীয়াকে অম্বিকা বলে থাকেন।
সাধারনত শ্রী শ্রী দূর্গাদেবীর মহাষ্টমী পূজা অন্তে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অনেকের মতে নবমী পূজার দিন হোমের পর কুমার পূজা প্রশস্তা।


শ্রী শ্রী দূর্গাপূজায় অনুষ্ঠিত কুমারী পূজার সংকল্প বাক্যে বলা হয়-“বার্ষিক শরৎকালীন দূর্গামহা পূজাদি কম্নর্নঃ পরিপূর্ন ফল প্রাপ্তি কামঃ কুমারী পূজনে কম্নর্নঃ করিষ্যে” এই মন্ত্রার্থে বুঝা যায় কেবল প্রতি মার্য় দেবীর পূজাতে আংশিক ফল হয়, কিন্তু কুমারীতে দেবীর প্রকাশ উপলদ্ধি করে তাঁর পূজায় পরিপূর্ণ ফল পাওয়া যায়।
কুমারী পূজা করে কেন? মাটির প্রতিমায় তাঁর পূজা হয়-আর মানুষে তা হয় না! সব স্ত্রীলোক ভগবতীর এক একটি রূপ। শুদ্ধত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। মাকে কুমারীর ভিতর দেখতে পাই বলে কুমারী পূজা করি। কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্বহল, নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ লাভ। নারী জাতিতে পর মেশ্বরীর মহিমা ও মাধুর্যের উপলদ্ধি ভাবুক সধেকের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতায় শ্রী শ্রী রাম কৃষ্ণদেব অনন্যতা প্রকাশ করেছেন তাঁর সহধমিনী শ্রী শ্রী সারদা দেবীর দেহাবলম্বনে শ্রী শ্রী ফল হারিনী কালিকা পূজায় নিশীথ যামে ষোড়শী পূজার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সেদিন শ্রী শ্রী সারদাদেবীর মধ্যে বিশ্ব মার্তৃকার অধিষ্ঠান লক্ষ্য করেছিলেন এবং দীর্ঘদিনের সাধনার সহায়ক জপের মালাটি পর্যন্ত তিনি বিশ্বকল্যানী স্বরূপা শ্রী শ্রী সারদা দেবীর চরনে সমর্পন করে পরি সমাপ্তি করেন। এই অভূতপূর্ব ঘটনাদৃষ্টে নিঃ সন্দেহে বলা যায় কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ এক মহত্তম সাধন পদ্ধতি। এই সাধনার উপলব্ধিতে সাধকের নিকট সমগ্রবিশ্ব নারীমূতি পরিগ্রহ করে. “একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কামমাপরা”- বিশ্ব মাতৃকার এই ভাবপ্রবাহে সাধক নিজ অহংকে বিসর্জন দিয়ে মাতৃক্রোড়ে নিজেকে আবিষ্কার করেন অমৃতের সন্তান রূপে।

সংগ্রহ

লেখক স্বামী পরদেবানন্দের
“শ্রী শ্রী কুমারী পূজাতত্ব¡”
জ্ঞানাঞ্জন পত্রিকা প্রকাশিত
১৪২৫ বঙ্গাব্দে
৩০ তম শারদীয় সংখ্যা

Share This: