কল্পতরু ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ

উপাধ্যক্ষ উদয় শঙ্কর চক্রবর্ত্তী, জেনারেল সেক্রেটারী, শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম, কুড়িগ্রামঃ কল্পতরুর কাছে বসে যে যা চাইবে তা-ই পাবে। এজন্য সাধন ভজনের দ্বারা যখন মন শুদ্ধ হয়, তখন সবধরনের কামনা ত্যাগ করতে হয়, কেন জান ? একজন কোনো এক সময়ে ভ্রমন করতে করতে খুব বড় মাঠে গিয়ে উপস্থিত হলো। পথে রোদে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের জন্য একটা গাছের তলায় বসল মনে মনে ভাবলে যে-“এই সময় যদি একটা ভাল বিছানা পাই, তাহলে তাতে শুয়ে ঘুমুই”। সে,যে কল্পতরুর নিচে বসেছিল তা সে জানত না। মনে মনে যেই বাসনা হলো তখনই একটি উত্তম বিছানা এসে পড়ল। তখন ভাবতে লাগল-“এই সময় যদি একটি স্ত্রীলোক এসে আমার পদ সেবা করে, তাহলে খুব সুখে নিদ্রা যাই।” এই মনে হওয়াও যেমন, অমনি তখনই এক যুবতী এসে তার পদ সেবা করতে লাগল, তখন তার আর আনন্দের সীমারইল না। তারপর তার খুব ক্ষুধা পেলো, তখন সে মনে ভাবলো-যা চাইলুম, তা-ই তো পেলুম, তবে কিছু খাবার পাব না ? বলতে না বলতে তার কাছে অমনি নানা রকম খাবার এসে জুটল, সে সেইগুলো খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল-“এই সময় যদি একটা বাঘ এসেপড়ে তাহলে কী হয়?” যেমন এই মনে হওয়া অমনি এক প্রকান্ড বাঘ লাফ দিয়ে এসে তাকে মেরেফেললো। এই সংসারে জীবেরও ঠিক এইরূপ দশা ঘটে থাকে। ঈশ্বর-সাধন করতে গিয়ে বিষয়-ধন-জন অথবা মান-যশ ইত্যাদি কামনা করলে তা কিছু কিছু লাভ হয় বটে। কিন্তু শেষে বাঘেরও ভয় থাকে-অর্থাৎ রোগ, শোক, তাপ, অপমান ও বিষয় নাশ-রূপ বাঘ স্বাভাবিক বাঘ হতেও লক্ষ গুনে কষ্টদায়ক।
(শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথাসার, পঞ্চম সংস্করণ, ১৩৫৫ পৃ. ৬-৭)

প্রভুর প্রতিজ্ঞা ছিল শুন বিবরণ।
হাটতে ভাঙিব হাঁড়ি যাইব যখন ॥
সেই হাড়ি-ভাঙা রঙ্গঁ আজিকার দিনে।
কীভাবে ভাঙিলা হাঁড়ি শুন একমনে ॥

দক্ষিণেশ্বরে থাকাকালীন শেষের দিকে ঠাকুর একদিন বলে ছিলেন যাওয়ার আগে প্রেমের হাঁড়ি ভেঙে দিয়ে যাব যেমন কথা তেমন কাজ। সেই হাটে হাঁড়ি-ভাঙার দিনটি এসেছিল ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি তারিখে। ভাবতে সত্যি আশ্চর্য লাগে না কিযে, অবতীর্ন ভগবান নিজ প্রেমের হাড়ি ভেঙেছিলেন আমাদের এই সমস্যা-সমাকীর্ণ কলকাতা শহরের উপকন্ঠে। হাঁড়িভেঙে নিজ লীলা পুষ্ট করেছিলেন অপ্রকট হওয়ার সাড়ে ছয় মাস আগে রামচন্দ্র দত্ত প্রমুখ ভক্তগণ ঠাকুরের ঐ দিনের আত্মপ্রকাশকে (কল্পতরু) রূপ প্রদর্শন বলে বিখ্যাত করেছেন। কিন্তু স্বামী সারদানন্দ লিখেছেন: “উহাকে ঠাকুরের অভয় প্রকাশ অথবা আত্মপ্রকাশ পূর্বক সকলকে অভয় প্রদান বলিয়া অভিহিত করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।” কাশীপুরের উদ্যানবাটী গোপালচন্দ্র ঘোষের, ভাড়া নেওয়া হল মাসিক ৮০ টাকায়। সুরেন্দ্র ভাড়ার টাকা দেবেন, ভাড়া ছয় মাসের জন্য তিনিই অঙ্গীর পত্রে সই দেন। ১৮৮৫, ১১ ডিসেম্বর ঠাকুর শ্যামপুকুর থেকে কাশীপুর বাগানে আসেন দু’খানি ঘোড়ার গাড়ীতে শ্রীমা, সেবক লাটু, কালী ও বুড়ো গোপাল এক গাড়ীতে, অপর গাড়ীতে জিনিসপত্র ও সেবকদের নিয়ে যায়। কলকাতার ঘন সংবদ্ধ বাড়ী আর সংকীর্ন যান বহুল রাস্তা, ধূলি মলিন পরিবেশ ছেড়ে ফল-পুস্প সুবাসিত শ্যামল বৃক্ষশোভিত মুক্তবায়ু সঞ্চারিত নির্জন পরিবেশে ঠাকুর আনন্দিত, ভক্তগনও প্রভুর আনন্দ দেখে তৃপ্তি লাভ করলেন। শ্রী শ্রী মা ও ঐ উন্মুক্ত পরিবেশে থাকার প্রশস্ত ঘরে প্রবেশকরে প্রফুল্ল মনে হাঁফ ছাড়লেন কাশীপুর বাগান বাড়ীর বিস্তারিত বর্ণনা লীলা প্রসঙ্গ বিবৃত রয়েছে। আরো ঐ উদ্যান বাঢীতে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অন্ত্যলীলার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে লিখেছেন “এই উদ্যানেই ঠাকুর অগ্রহায়নের শেষে আগমন সন ১২৯১ সানের শীত ও বসন্তকাল এবং ১২৯২ সানের গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু অতিবাহিত করিয়াছিলেন। ঐ আটমাস কাল ব্যাধি যেমন প্রতিনিয়ত প্রবৃদ্ধ হইয়া তাহার দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীরকে জীর্ণ-ভগ্ন করিয়া শুস্ক কঙ্কালে পরিনত করিয়াছিল। তাহার সংযমসিদ্ধ মনও তেমনি উহার প্রকোপ ও যন্ত্রণা এককালে অগ্রাহ্য করিয়া তিনি ব্যক্তিগত এবং মন্ডলীগত ভাবে ভক্তসংঘের মধ্যে যে কার্য ইতিপূর্বে করিয়াছিলেন তাহার পরিসমাপ্তির জন্য নিরন্তর নিযুক্ত থাকিয়া প্রয়োজনমত তাহাদিগকে শিক্ষা দীক্ষাদি প্রদানে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। কেবল তাহাই নহে, ঠাকুর দক্ষিনেশ্বরে অবস্থান কালে নিজ সম্বন্ধে যে সকল ভবিষ্যৎ কথা ভক্তগণকে অনেক সময় বলিয়াছেন যথা-“যাইবার আগে হাটে হাঁড়ি দিব” যখন অধিক লোকে জানিতে পারিবে, কানাকানি করিবে তখন (নিজ শরীর দেখাইয়া) এই খেলাটা আর থাকিবে না, মার (জগৎমাতার) ইচ্ছায় ভাঙ্গিয়া যাইবে।” ভক্তগনের মধ্যে কাহারা অন্তরঙ্গ ও কাহারা বহিরঙ্গ তাহা এই সময়ে নিরুপিত হইবে, ইত্যাদি-এই সকল কথার সাফল্য আমরা এখানে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। নরেন্দ্র নাথ প্রমুখ ভক্তগন সম্বন্বীয় তাহার ভবিষ্যৎ বানী সকলের সফলতাও আমরা এই স্থানে বুঝিতে সমর্থ হইয়াছিলাম, যথা-“মা তোকে (নরেন্দ্রকে) তাঁর কাজ করিবার জন্য সংসারে টানিয়া আনিয়াছেন” আমার পশ্চাতে তোকে ফিরিতেই হইবে, তুই যাইবি কোথায় এরা সব (বালক ভক্তগণ) যেন হোমা পাখির শাবকের ন্যায়, হোমা পাখি আকাশে বহু উচ্চে উঠিয়া অন্ড প্রসব করে, সুতরাং প্রসবের পরে উহার অন্ডসকল প্রবল বেগে পৃথিবীর দিকে নামিতে থাকে-ভয় হয় মাটিতে পড়িয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যাইবে। কিন্তু তাহা হয়না, ভূমিস্পর্শ করিবার পূর্বেই অন্ড বিদীর্ণ করিয়া পুনরায় উর্দ্ধে আকাশে উড়িয়া যায়; ইহারাও সেইরূপ সংসারে আবদ্ধ হইবার পূর্বেই সংসার ছাড়িয়া ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হইবে। তদ্ভিন্ন নরেন্দ্রের জীবন গঠনপূর্বক তাহার উপরে নিজ ভক্তমন্ডলীর বিশেষত: বালক ভক্তসকলের ভারাপর্ন করা ও তাহাদিগকে কি রূপে পরিচালনা করিতে হইবে তদ্বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া ঠাকুর এই স্থানেই করিয়াছিলেন। সুতরাং কাশীপুর উদ্যানে সংসাধিত ঠাকুরের কার্যসকলের যে বিশেষ গুরুত্ব ছিল তাহা বলিতে হইবেনা। শ্রীশ্রীমা বলেছিলেন-কাশীপুর বাগান তাঁর অন্ত্যলীলার স্থান। কত তপস্যা, ধ্যান, সমাধি! তার মহা সমাধি স্থান-সিদ্ধস্থান। কাশীপুরে আসার প্রথম দিন রাতে গিরিশ ও মাস্টার ছাড়াও সেবক ভক্তগন রয়েছেন। কথা হল ঠাকুরের যা অবস্থা-ঘরেই পায়খানার ব্যবস্থা করতে হবে। লাটু হাত জোড় করে বললেন, ‘যে আজ্ঞে, হামি ত আপনার মেস্তর আছি, হামি ময়লা সাফ করবে’। প্রসঙ্গে ‘আমার জীবনকথা’ গ্রন্থে স্বামী অভেদানন্দ লিখেছেন “প্রথম প্রথম আমরা দুই-তিনজন শ্রীশ্রী ঠাকুরের সেবা-শুশ্রুষা করিতাম, শ্রীমা শ্রীশ্রী ঠাকুরের পথ্যরন্ধন করিতেন, গোপাল মা ও লক্ষীদিদি শ্রীমাকে সাহায্য করিতেন।” সেবকগণ পালাক্রমে সমস্তকার্য, যথাগৃহ পরিস্কার করা, বাসন মাজা, বাজার করা ইত্যাদি ভাগ করিয়া লইয়াছিল। সুতরাং ক্রমশ: শ্রীশ্রী ঠাকুরের সেবা-শুশ্রƒষার জন্য বেশী সেবকের আবশ্যক হইয়া পড়িল। তখন তাহার অন্তরঙ্গ ভক্তগণ-নরেন্দ্রনাথ, রাখাল, যোগেন, শরৎ, শশী, বুড়োগোপাল, বাবুরাম, হুটগোগোপাল প্রভৃতি আসিয়া আমাকে ও লাটুকে সাহায্য করিতে লাগিল, তাহারা কাশীপুরের বাগানে আসিয়া ক্রমশ: অবস্থান করিতেলাগিল। ডা: রাজেন্দ্র বাবুর ঔষধে দিন পনেররও বেশি বেশ বোধ করেছিলেন। ভক্তগণও আশা পোষন করতেন-এবারে ঠাকুর সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ১৮৮৬-র প্রথমদিন ১ জানুয়ারি। আপিস স্কুল কলেজ বন্ধ-দুপুরের পরেই একে একে কাশীপুর বাগান বাড়ীতে এসে সমবেত হচ্ছিলেন ভক্তরা। ঠাকুরও বিকাল ৩ টায় বাগানে বেড়াবার জন্য দোতালা থেকে নেমে এলেন, তখন ত্রিশ জনেরও বেশী গৃহী ও যুবক ভক্ত গাছের তলায় বসে বা এখানে সেখানে কথাবার্তা বলছিল। ঠাকুর তাদের দেখতে পেলেন, তারাও ঠাকুরকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে সেখান থেকেই মাথা নুইয়ে প্রণাম করেই সকলে ঠাকুরের কাছে এগিয়ে এলেন। আনন্দিত ঠাকুর তাদের মধ্যে গিরিশকে লক্ষ্য করে সহসা জিজ্ঞেস করলেন, গিরিশ, তুমি যে সকলকে এতকথা (আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে) বলে বেড়াও, তুমি (আমার সম্বন্ধে) কি দেখেছ, কি বুঝেছ ? গিরিশ তাঁর পদপ্রান্তে হাটু গেড়ে বসে উর্দ্ধমুখে করজোড়ে ভাববিহবল কন্ঠে গদ গদ স্বরে বলে উঠলেন-“ব্যাস-বাল্লীকি যাঁরা ইয়ত্তা করতে পারেননি, আমি তাঁর সম্বন্ধে বেশি আর কি বলতে পারি। গিরিশের এই সরল সবল বিশ্বাসে ঠাকুর মুগ্ধ হলেন ও তাদের সকলকে লক্ষ্য করে বললেন “তোমাদের কি আর বলব, আশীর্বাদ করি, তোমাদের চৈতন্য হউক।” ভক্তদের প্রতিপ্রেম ও করুনায় আত্মহারা হয়ে ভাবাবিষ্ট হলেন। তাঁর ঐ শক্তিপূত কথায় ভক্তদের অন্তরকে ঈশ্বর প্রেমে উদ্বেলিত করে তুলল, তারা দেশকাল ভুলে গেল, ঠাকুরের ব্যাধিভুলে ব্যাধি আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে স্পর্শ করবেনা বলে যে সঙ্কল্প করেছিল তা ভুলে গেল-অনুভব করল ত্রিদেব থেকে আগত কোন দেবতা তাদের অনন্ত শান্তি দেবার জন্য আবির্ভুত হয়েছেন। তারা প্রণাম করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল ও জয়রবে বাগানবাড়ী মুখরিত করে, একে একে প্রণাম করতে লাগলেন। প্রণাম করার কালে ঠাকুর প্রসন্ন করুনায় তাদের স্পর্শ করতে লাগলেন। সেই শক্তিপূত স্পর্শে ভক্তগণ নিজ নিজ ভাব অনুসারে ঈশ্বরের ভাব ও রূপ অনুভব করতে লাগলেন। কেহ মন্ত্রমুগ্ধবৎ ইষ্টদেবতার দর্শনে গভীর ধ্যানমগ্ন, কেহবা ঠাকুরের কৃপালাভের জন্য অপর সকলকে চিৎকার করে আহ্বান করতে লাগলেন, কেহ অশ্রুপাত, কেহবা অপার আনন্দে হাসতে লাগলেন। অপর কেহ বা মন্ত্রোচ্চারণ করে ফুল তুলে তাঁর শ্রীঅঙ্গেনিক্ষেপ করে পুজো করতে লাগলেন। সকলে বুঝল আজ ঠাকুর হাটে হাড়ি ভেঙ্গেদিলেন অর্থাৎ তিনি যে স্বয়ং ঈশ্বর জীবকল্যাণে অবতার দেহ ধারণ করেছেন তা জগৎ সমক্ষে প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেন। তারা বুঝলেন ঠাকুর নিজ দেবত্বের কথা আর লুকিয়ে রাখতে পারবেন না, পাপীতাপী সকলে এখন সমভাবে তাঁর চরনোশ্রয়ে স্থান পাবে। কিছুকাল ঐরূপ দিব্যানন্দে কেটে গেলে পর ঠাকুরের ভাব প্রশমিত হলে ঠাকুর ঘরে ফিরলেন, ভক্তগনও প্রকৃতিস্থ হলেন। এভাবে ১ জানুয়ারিতে যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে শ্রীরামকৃষ্ণদেব প্রকাশ্যে জানান দিলেন যে, তিনি ভগবান-একালে আবির্র্ভুত হয়েছেন-শ্রীরামকৃষ্ণরূপে। তাই ঠাকুরের উপদেশ তোমাদের চৈতন্য হোক। ঠাকুর সাচ্চা কল্পতরু তিনি যে শুধু চাইতে শিখিয়েছেন তা নয়, কী চাইতে হয় তা-ও শিখিয়েছেন। কী চাইতে হয় যদি না জানি তবে তো কল্পতরুর নিচে বসে শুধু খাটিয়া-জল-সেবাই পাব না, পাব শেষ পর্যন্ত বাঘও। তাই লাউ কুমড়ো চাওয়াকে তিনি হীনবুদ্ধির লক্ষণ বললেন। কিন্তু আমরা যে সাধারন মানুষ, ঠাকুর। লাউ-কুমড়োই আমাদের চাহিদা, মানলেন না তিনি সে-কথা। বললেন “তুমি বোঝ আর না বোঝ, তুমিই রাম” তুমি অমৃতের সন্তান। অনন্তের তুমি অধিকারী তুমি ক্ষুদ্র নও, বাইরের পরিবেশ ও তোমার কাছে দুর্বল। তোমার মধ্যে রয়েছে অসীমের সম্ভাবনা। ১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারিতে ঠাকুরের কল্পতরু হওয়া গভীর তাৎপর্য পূর্ণ ঘটনা। তিনি ভক্তদের চাহিদামত প্রথম দুটি তো দিলেনই, সেই সঙ্গে আশির্বাদ করে বললেন “তোমাদের চৈতন্যহোক”। অর্থাৎ তৃতীয়টিকে ভক্তদের মনে গেথে দিলেন। কল্পতরু-কল্পান্ত স্থায়ী তরু। সমুদ্র মহ্নন হতে উত্থিতত এই বৃক্ষ কল্পান্ত হলে পুনরায় সমুদ্রগর্ভে নিমজ্জিত হয়, দেবরাজ ইন্দ্রের স্বর্গে কল্পতরুর অবস্থান। বাঞ্চাপূরণকারী এই পৌরানিক বৃক্ষের কথা ভাগবতে, রঘুবংশে হিতোপদেশ এবং বিভিন্ন বৈষ্ণবশাস্ত্রে উল্লিখিত আছে। শিবাষ্টক স্ত্রোত্রে আছে-“প্রনমা মি-শিবং শিব কল্পতরুম”-অর্থাৎ সেই মঙ্গলের কল্পবৃক্ষ স্বরুপ শিবকে প্রণাম করি।
‘কল্পতরু’ শব্দটা শোনামাত্র প্রাণে একটা আশার সঞ্চার হয়। মনে হয় যেন কল্পতরুর কাছে গিয়ে যত কামনা বাসনা পূরণ করে নিই। কিন্তু অবোধ মন বোঝেনা-কামনার ইতি নেই। ঘি যেমন আগুন নেভাতে পারেনা। বরং তা বৃদ্ধি করে, তেমনি কামনা ভোগের দ্বারা কামনা নিবৃত্ত হয় না।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন “ঈশ্বর কল্পতরু”। সে যা চাইবে , তা-ই পাবে। কিন্তু কল্পতরুর কাছ থেকে চাইতে হয়, তবে কথা থাকে”। ঠাকুর প্রথমে সংসারে মুগ্ধ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ঈশ্বর কল্পতরু। তারপর বলেছেন, সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর সব কামনা পূরণ করতে পারেন। অবশেষে তিনি বলেছেন যে, দূর থেকে কল্পতরুর কাছে চাইলে কাজ হবে না। ঐ অভীষ্ট ফলদায়ক বৃক্ষের কাছে গিয়ে বা নিচে দাড়িয়ে চাইতে হয়। তবেই বাসনা পূরণ হবে। “কালী কল্পতরু মূলে রে মন, চারি ফল কুড়ায়ে পাবি”। আবার শুদ্ধমন না হলে ভগবানের কাছে যেতে প্রবৃত্তি হয় না এবং শুদ্ধ সনে অশুদ্ধ আজে-বাজে জাগতিক বাসনাও ওঠেনা। তাই ঠাকুর বলেছেন-ঈশ্বরচিন্তা যত করবে, ততই সংসারের সামান্য ভোগের জিনিসে আসক্তি কমবে। ঈশ্বর লাউ, কুমড়ো ফল দেননা। তিনি অমৃত ফলদেন “জ্ঞান, প্রেম, বিবেক, বৈরাগ্য”। আশাহীন, ভেঙে-পড়া মানুষকে ঠাকুর কল্পতরুর কথা বলে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আবার নিজে কল্পতরু হয়ে তাদের হৃদয়ে চৈতন্য দান করেছেন, জগতের লোককে ঈশ্বরমুখী করাই ঠাকুরের উদ্দেশ্য-কারন পরম শান্তি ও শাশ্বত আনন্দ। শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ে মত্ত মানুষকে বিকারের রোগীর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন “বিকার থাকলে কত কী বলে-আমি পাঁচসের চালের ভাত খাবরে”। এই এক জালা জল খাবরে। বৈদ্য বলে, খাবি? আচ্ছা খাবি। এই বলে বৈদ্য তামাক খায়, বিকারসেরে, যা বলবে তা-ই শুনতে হয়”।

বিষয়ই বিষ, ঐ বিষে জ্বালা। আর ঐ জ্বালা জুড়াবে দুর-দুরান্ত থেকে মানুষ বছরের অন্তত একটাদিন (১ জানুয়ারি) কাশীপুরের উদ্যানবাটীতে উপস্থিত হয়। কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা-তিনি যেন আমাদের সকলের ওপর তাঁর সেই চিরকালের অমোঘ আশীর্বাদ “চৈতন্য হউক”। সদাবর্ষন করেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ চরিত্রকথা-স্বামী অমৃতত্বান্দ
কল্পতরু শ্রীরামকৃষ্ণ-গন্ধলক-স্বামী চৈতন্যনন্দ

Share This:

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.