এবার আগে-ভাগেই ঢাকা ছাড়ছে মানুষ

ঈদ সামনে রেখে মানুষের রাজধানী থেকে গ্রামে যাওয়ার প্রবণতায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই ঈদ ঘিরে লকডাউন আরো কঠোর হতে পারে এমন আশঙ্কায় এবার একটু আগে ভাগেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, সাধারণ ছুটির বিষয়টি কতদিন পর্যন্ত হবে সেটা নিয়ে একটু দুশ্চিন্তায় ছিলাম। ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

তিনি আরো বলেন, ঢাকায় থাকাটা দিনে দিনে অনিরাপদ হয়ে উঠছে। প্রয়োজনীয় কিছু টুকটাক জিনিস তো লাগেই। এ কারণে ইচ্ছা না থাকলেও বাসা থেকে বের হতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জিনিসের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনছি।

‘এছাড়াও একটি ফ্ল্যাটে কতদিন আর আটকে থাকা যায়। গ্রামে বড় বাড়ি ও মানুষের ঘনত্ব অনেক কম। সবকিছু মিলিয়ে গ্রামকে নিরাপদ মনে করছি’ যোগ করেন তিনি।

তবে রাজধানী ছাড়তে গণপরিবহন না পেয়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত গাড়ির উপর ভরসা রাখছেন তিনি। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ গভীর রাতে ট্রাকে করে রাজধানী ছাড়ছেন।

বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে কথা হয় ঢাকার একটি বাসায় নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করা সাইদুর রহমানের সঙ্গে। হঠাৎ করেই গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন আসে তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ। এমন অবস্থায় দ্রুত রাজধানী ছাড়ার উপায় খুঁজছিলেন তিনি।

এজন্য তিনি তার এলাকার কাঁচাবাজারে একটি আরতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে জানানো হয়। শনিবার রাতে একটি সবজির ট্রাক রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় আসবে এবং রাতেই আবার রাজধানী ছেড়ে যাবে। পরে আরত থেকেই সাইদুরের সঙ্গে ট্রাকচালকের যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়।

পরের দিন রোববার সকালে বগুড়া থেকে সাইদুর মোবাইল ফোনে বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ‘সড়কে গণপরিবহন বাদে সব ধরনের যানবাহন ছিল। সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস চলাচল করতে দেখা গেছে। এসব যানবাহনে যাত্রীদের সংখ্যাও ছিলো অনেক বেশি।’

‘এমনকি সাইদুর যে ট্রাকে রাজধানী ছেড়েছিলো সেই ফাঁকা ট্রাকে তার সঙ্গে আরও অনেকেই রাজধানী ছেড়েছে’ বলেও জানান তিনি।

এদিকে অভিযোগ আছে, নগরীর অনেকেই সরাসরি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গিয়ে ভিড় করছেন। সেখানে ট্রাক অথবা অন্য যানে করে কাঁচা তরকারি নিয়ে আসা চালকদের সঙ্গে কথা বলে যে যেভাবে পারছেন নিজ গন্তব্যের দিকে রওনা দিচ্ছেন। যারা ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তাদের একটা বড় অংশই রাজধানীতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাজ না থাকায় বেকায়দায় পড়ে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জার্নালের সাথে কথা হয় রাজধানীর পশ্চিম ট্রাফিক বিভাগের এসি জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি এমন সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘সরকার নির্দেশিত জরুরি পরিবহন বাদে কাউকে প্রবেশ বা বের হতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি কোন খালি ট্রাকে মানুষ আছে কিনা তা পরীক্ষা করে তবেই ছাড়া হচ্ছে। যদি কোন ট্রাকে মানুষ পাওয়া যায় তবে চালককে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’

ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একমাত্র মেডিকেল ইমারর্জেন্সি ছাড়া কোন ব্যক্তিগত গাড়িকেও প্রবেশ বা বের হতে দেয়া হচ্ছে না।’

ঈদকে সামনে রেখে দেশের লকডাউন পরিস্থিতি যে আরো কঠোর হবে সেটি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে কিছুটা আঁচ করা গিয়েছিলো।

গত শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সরকারের এই মন্ত্রী বলেছিলেন, করোনাভাইরাস সঙ্কটের মধ্যেও মানুষ সামাজিক দূরত্ব না মেনে দলে দলে গ্রামের দিকে যেতে শুরু করেছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। তিনি শপিংমল ফেরিঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ভিড় করা থেকে বিরত থাকার আহ্বানও জানান।

অন্যদিকে জেলা শহর গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্য জেলা থেকে প্রবেশের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। নতুন করে জেলায় প্রবেশ করতে চাইলে অবশ্যই তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন মেনেই ঢুকতে হবে। তাদের ভাষ্য, যে যেখানেই আছেন সেখানেই নিরাপদ।

যদিও দেশের উপশহর ও গ্রামগুলোতে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর থেকে ফিরে যাওয়া মানুষদের নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। যতটা সম্ভব হচ্ছে সেই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে পাঠানোর চেষ্টা করছেন এলাকার সাধারণ মানুষেরাই। সেটা সম্ভব না হলে গৃহবন্দী এবং বাড়িতে লাল পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছেন সচেতন ব্যক্তিরা।

দেশের সর্বো উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের একটি গ্রামের বাসিন্দা ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর থেকে এখানে দু’জন ব্যক্তি এসেছেন। তাদেরকে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের বাড়িতে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে। খাদ্য বা চিকিৎসার মতো কোন প্রয়োজন হলে সেটা সরবরাহ করা হচ্ছে।’

Share This: