আমার দেখা শিক্ষক আব্দুল কাদের

সাফল্যের চুড়ায় পৌঁছানো যে ক’ জন ব্যক্তিকে দেখেছি তার মধ্যে অন্যতম হলেন শিক্ষক আব্দুল কাদের। আজকের লেখায় তারই গল্প শোনাবো।
কৃর্তিমান ব্যক্তি শিক্ষক আব্দুল কাদের এখন আর আমাদের মাঝে নেই। গত বছরের এই দিনে তিনি সব্বাইকে ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছেন। রেখে গেছেন অসংখ্য স্মৃতি আর সাফল্যের ছাপ।
১৯২৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারী তৎকালীন গাইবান্ধা মহুকুমার সুন্দরগঞ্জ থানার বেলকা ইউনিয়নের শান্তিরাম গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আব্দুল কাদের জন্ম লাভ করেন। তার পিতা ছিলেন ফজর উদ্দিন মুন্সি। মাতা আছমা বেগম। দু’ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন বড়। তার প্রথম বিদ্যাপিঠ চন্দ্রিতাবাড়ী মক্তব। এরপর তিনি ভর্তি হন মনিন্দ্র চন্দ্র হাই ইংলিশ স্কুলে (বর্তমানে বেলকা হাই স্কুল)। কলকাতা ইউনিভার্সিটির তত্ত্বাবধায়নে ১৯৪৭ সালে ওই বিদ্যালয় থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে ১৯৬২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬৬ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। সর্বশেষ ১৯৬৮ সালে ময়মনসিংহ টিটি কলেজ থেকে বি.এড ডিগ্রী লাভ করেন।
তিনি বেছে নেন মহান শিক্ষকতা পেশা। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত নিজ এলাকার কম্পালসরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৫৭ সালে তিনি কুড়িগ্রামের চিলমারী জুনিয়র গার্লস স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহন করেন। এখানে তিনি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। চাকুরীর সুত্রে ওই সালেই তিনি তৎকালীন কুড়িগ্রাম নিউ টাউন মডেল গার্লস স্কুলে (বর্তমানে কুড়িগ্রাম সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে কুড়িগ্রাম পিটিআইতে ইন্সট্রাকটর পদে বদলী হয়ে আসেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত এখানেই কর্মরত থেকেই অবসর জীবন গ্রহন করেন।
তিনি ১৯৫৬ সালে চিলমারীর সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের লুৎফর রহমান খন্দকারের কন্যা সাজেদা খাতুন রেখার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহকালীন সময় তার স্ত্রী ছিলেন ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। কিন্তু বিয়ের পর স্ত্রীর পড়া লেখা বন্ধ করেননি। তার স্ত্রীও স্বামীর কর্মস্থল চিলমারী জুনিয়র গালর্স স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। এরপর স্বামী আব্দুল কাদেরের সুবাদে স্ত্রী সাজেদা খাতুন রেখা তৎকালীন কুড়িগ্রাম নিউ টাউন মডেল গার্লস স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৬৯ সালে আমি সেনের খামার জুনিয়র স্কুল থেকে কুড়িগ্রাম সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হই। এখানেই পরিচয় হয় শিক্ষক আব্দুল কাদেরের বড় ছেলে মেধাবী ছাত্র ছাইফুর রহমানের সাথে। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল ছিল না। ফলে তাদের বাসায় থাকা-খাওয়ার বিষয়টি ছিল আমার নৈমিত্তিক ব্যাপার। এরই সুবাদে পরিবারটির সাথে আমার সখ্যতা বহুগুন বেড়ে যায়। যে সখ্যতার বন্ধন আজঅবদি অটুট রয়েছে।
বলতে গেলে রক্তের বন্ধন উতরিয়ে আত্মার আত্মিয়তে পরিণত হয়েছে।
বন্ধু ছাইফুরের বাবা ও মা দু’ জনেই তাদের ৯ রত্ন সন্তানের সাথে আমাকেও যোগ করে নিয়ে সন্তানের মর্যাদা দিয়েছেন। যার ঋণ কখনোই শোধ হবার নয়।
শিক্ষক দম্পতি আব্দুর কাদের ও সাজেদা খাতুন রেখার বড় সফলতা হচ্ছে ৯ রত্ন সন্তান। শিক্ষকতার মতো পেশায় থেকে ৯ সন্তানকে যোগ্য করে গড়ে তোলা যায় তার উদাহরণ তারাই।
তাদের প্রথম সন্তান ডাঃ ছাইফুর রহমান। সে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছে।
দ্বিতীয় সন্তান প্রকৌশলী শফিকুর রহমান। ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ার, ফেডারেল গভ. অব কেলিফোর্নিয়া, ইউএসএ’তে কর্মরত আছে।
তৃতীয় সন্তান কৃষিবিদ শামসুর রহমান। সে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন’র টেকনিক্যাল সার্ভিসেস বিভাগের চিফ পদে রয়েছে।
চতুর্থ সন্তান ডাঃ কামরুন নাহার। সে গঙ্গাছড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার পদে কর্মরত ।
পঞ্চম সন্তান রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান। সে অষ্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসবে কর্মরত রয়েছে।
ষষ্ঠ সন্তান ডাঃ নাজমুন নাহার। সে দক্ষিণ আফ্রিকার পোর্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পদে দায়িত্ব পালন করছে।
সপ্তম সন্তান ডাঃ মাহতাবুন নাহার। সে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের সহযোগি অধ্যাপক পদে রয়েছে।
অষ্টম সন্তান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজেদুর রহমান। সে কুমিল্লা সেনা নিবাসে রয়েছে।
নবম সন্তান জেসমুন নাহার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব পদে রয়েছে।
পিতৃতুল্য শিক্ষক আব্দুল কাদের ছিলেন একজন পর হেজগার ব্যক্তি। তাকে কখনো নামাজ ক্বাজা করতে দেখিনি। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করতেন। পবিত্র কোরআন শরীফের সাথে ছিল তার দারুন সখ্যতা। প্রতিদিনই তিনি কোরআন পড়তেন। কারো সাথে তার অবনিতা ছিল না। ঝামেলা এড়িয়ে চলতেন। পরিবার আর সন্তানের দিকে ছিল তার তিক্ষè নজরদারী। উপার্জিত অর্থ দ্বারা নিজে এতোটুকু বিলাসিতা করতেন না। সব অর্থই সন্তানদের পড়া লেখার পিছনে ব্যয় করতেন। অসততা তাকে ছুতে পারেনি।
সততার পুরস্কার স্বরূপ মহান রাব্বুল আল আমিন তার ৯ সন্তানকেই নিজ নিজ অঙ্গনে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তিনি জীবদশ্মায় সেই পূরস্কার দেখে গেছেন।
জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটিয়েছেন বড় ছেলে ডা: ছাইফুর রহমানের রাজশাহীর বাসায়। সেখানে কোন ধরনেরই অসুবিধা ছিল না। কিন্তু তিনি বড্ড ভালবাসতেন কুড়িগ্রামকে। বার বার চলে আসতে চেয়ে ছিলেন কুড়িগ্রামে। শায়িত হতে চেয়ে ছিলেন এই কুড়িগ্রামের মাটিতেই। কিন্তু গুরুতর অসুস্থ হলে ভর্তি করা হয় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কয়েক দিন নিবিড় চিকিৎসার পর ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ সব্বাইকে ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে আর কড়িগ্রাম আনা সম্ভব হয়নি। সবার সম্মতিতেই শায়িত করা হয় রাজশাহীর মাটিতেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রযোজন তার ইচ্ছা ছিল আমি যেন তাকে শেষ শয়নে শায়িত করি। আমি তার সেই শেষ ইচ্ছাটি রাখতে পেরে মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট শুকরিয়া আদায় করছি।
কৃত্তিমান এই মানুষটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমি সাজেদা-কাদের ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেই। যে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছি। সাজেদা-কাদের ফাউন্ডেশন’র চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন তার বড় ছেলে আমার বন্ধু ডাঃ ছাইফুর রহমান আর তাদের পরিবারের সম্মতিতেই প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি আমি নিজে।
এখানে বলা প্রয়োজন- শিক্ষক দম্পতির ৯ সন্তানই সাজেদা-কাদের ফাউন্ডেশন’র ডোনার হিসেবে রয়েছে। তাদের অর্থায়নে দীর্ঘ একযুগ ধরে কুড়িগ্রামে আর্ত মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছে এই ফাউন্ডেশন।
আজ শিক্ষক আব্দুল কাদেরের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর দিনে তার জন্য মহান রাব্বুল আল আমিনের দরবারে মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তার সহায় হোন।

Share This:

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.